ড. রতন ভট্টাচার্য
বাংলার সমাজসংস্কার ও নারীজাগরণের ইতিহাসে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন লেখিকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, নারীশিক্ষার প্রবক্তা এবং এক দূরদর্শী মানবতাবাদী চিন্তাবিদ। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন ভারতীয় মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশে নারীরা শিক্ষা, স্বাধীন চিন্তা এবং সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তখন রোকেয়া সাহসের সঙ্গে সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কলম যেমন সমাজের অসংগতি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে, তেমনি তাঁর বাস্তব কর্মকাণ্ড নারীকে আত্মনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়ার পথ তৈরি করেছে।
বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। সেই সময় মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশেষত মুসলিম পরিবারের মেয়েদের ইংরেজি বা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার বিষয়ে সামাজিক আপত্তি ছিল প্রবল। রোকেয়ার ভাই-বোনদের কাছ থেকে তিনি গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখেন। এই গোপন শিক্ষাই পরবর্তীকালে তাঁর চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীকে পিছিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিক্ষার অভাব। তাই নারীশিক্ষাকে তিনি তাঁর সামাজিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন।
রোকেয়ার কাছে শিক্ষা ছিল কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়। শিক্ষা মানুষের বিবেক, যুক্তিবোধ ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলে—এই বিশ্বাস তাঁর সমগ্র জীবন ও কর্মের ভিত। তিনি বুঝেছিলেন, যে নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, সে সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। তাই নারীর মুক্তির প্রথম শর্ত হিসেবে তিনি শিক্ষাকে সামনে এনেছিলেন। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে—নারীকে অজ্ঞ রেখে কোনো সমাজ প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না।
১৯০৯ সালে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর রোকেয়া নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ভাগলপুরে স্বামীর স্মৃতিতে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীকালে কলকাতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত ও সম্প্রসারিত হয়। শুরুতে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে পরিবারগুলির মধ্যে নানা সংশয় ও সামাজিক বাধা ছিল। রোকেয়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার জন্য সমাজের মানসিকতাকেও পরিবর্তন করতে হবে।
সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল তাঁর নারীশিক্ষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে মেয়েদের শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেওয়া হতো না; তাদের নৈতিকতা, স্বাস্থ্য, ব্যবহারিক জ্ঞান এবং আত্মনির্ভরতার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল আধুনিক ও মানবিক। তিনি এমন শিক্ষা চেয়েছিলেন যা একজন মেয়েকে সংসারের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজের সক্রিয় সদস্যে পরিণত করবে।
রোকেয়ার সামাজিক অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তাঁর সময়ে নারীদের জীবনে পর্দাপ্রথা, বাল্যবিবাহ, অশিক্ষা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি কোনো একটি সম্প্রদায়ের নারীকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি; বরং নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল—নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান মানবিক মর্যাদা থাকা উচিত।
তবে রোকেয়ার সমালোচনা ছিল যুক্তিনির্ভর। তিনি পুরুষবিদ্বেষী ছিলেন না। তিনি এমন সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে নারী-পুরুষ পরস্পরের সহযোগী হবে। তাঁর মতে, সমাজের অর্ধেক মানুষকে পিছিয়ে রেখে কোনো জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। এই চিন্তা আজকের ‘gender equality’ বা লিঙ্গসমতার ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তাঁর সাহিত্যও ছিল তাঁর সামাজিক আন্দোলনের শক্তিশালী অস্ত্র। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ তাঁর অন্যতম বিখ্যাত রচনা। এই ইংরেজি রচনায় তিনি ‘Ladyland’-এর কল্পিত এক সমাজ নির্মাণ করেন, যেখানে নারীরা জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রশাসনে নেতৃত্ব দেয় এবং পুরুষরা গৃহের অন্তঃপুরে অবস্থান করে। এই ব্যঙ্গাত্মক উলটপালটের মাধ্যমে রোকেয়া আসলে প্রশ্ন তুলেছিলেন—যে সামাজিক ব্যবস্থা নারীদের ঘরে বন্দি রাখে, সেটি কি সত্যিই স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত? ‘সুলতানার স্বপ্ন’ তাই শুধু কল্পকাহিনি নয়; এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিবাদ।
তাঁর ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থেও নারীর বন্দিত্বের নানা বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। পর্দা ও সামাজিক বিধিনিষেধ কীভাবে নারীর স্বাভাবিক জীবন, শিক্ষা ও চলাফেরার স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছিল, তিনি তা তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখার শক্তি এখানেই যে তিনি কেবল অভিযোগ করেননি; তিনি পাঠককে নিজের সমাজকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করেছেন।
‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসেও তাঁর সমাজচিন্তার বিস্তার দেখা যায়। এখানে তিনি নারীদের জন্য একটি বিকল্প সামাজিক পরিসরের কল্পনা করেছেন, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারী একসঙ্গে কাজ করে আত্মনির্ভর জীবন গড়ে তোলে। এই রচনায় নারীকল্যাণ, মানবতাবাদ, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ একসূত্রে যুক্ত হয়েছে। ফলে রোকেয়ার সমাজভাবনা ছিল একই সঙ্গে নারী-কেন্দ্রিক এবং মানবিক।
নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও রোকেয়ার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯১৬ সালে তিনি আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও কল্যাণের জন্য কাজ করা হয়। অসহায় নারীদের সাহায্য করা, শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং সামাজিক সমস্যার বিষয়ে নারীদের সচেতন করে তোলা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। রোকেয়া বুঝেছিলেন যে ব্যক্তিগতভাবে কিছু নারীকে শিক্ষিত করলেই বৃহত্তর পরিবর্তন আসবে না; নারীদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
তাঁর সামাজিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব। তিনি জানতেন, যে নারী সম্পূর্ণভাবে অন্যের অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তার সামাজিক স্বাধীনতাও সীমিত। তাই মেয়েদের এমন শিক্ষা দেওয়ার কথা তিনি বলেছেন, যার মাধ্যমে তারা জীবিকা অর্জন করতে পারে। শিক্ষকতা, চিকিৎসা, কারিগরি কাজসহ বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর এই চিন্তা আজকের নারী-স্বনির্ভরতা ও কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকারের ধারণার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রোকেয়ার সমাজসংস্কারের আরেকটি দিক ছিল কুসংস্কার ও অন্ধ অনুকরণের বিরোধিতা। তিনি ধর্মের মানবিক ও নৈতিক শিক্ষাকে সম্মান করতেন, কিন্তু ধর্মের নামে নারীর ওপর অন্যায় সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর যুক্তিবাদী মন তাঁকে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল। তিনি মনে করতেন, কোনো প্রথা শুধু পুরোনো বলেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; সেটি মানুষের কল্যাণে কাজ করছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
শিশু ও নারী—এই দুই শ্রেণির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল গভীর। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি শিক্ষিত মা পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে পারেন। ফলে নারীশিক্ষার সুফল কেবল একজন নারীর জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে। এই কারণে নারীশিক্ষাকে তিনি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
রোকেয়ার ভাষা ও লেখার ধরনও তাঁর সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি কঠিন তাত্ত্বিক ভাষায় নয়, সহজ, তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক ও যুক্তিনির্ভর ভাষায় কথা বলেছেন। তাঁর ব্যঙ্গের মধ্যে হাস্যরস থাকলেও তার অন্তরালে ছিল গভীর সামাজিক প্রতিবাদ। তিনি পাঠককে আঘাত না করে ভাবতে বাধ্য করেছেন। এই সাহিত্যিক কৌশল তাঁর সমাজসংস্কারমূলক বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।
আজকের দিনে বেগম রোকেয়ার অবদানকে শুধু নারীশিক্ষার ইতিহাসে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তাঁর চিন্তা আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি। মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, নিজের মত প্রকাশ এবং সামাজিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ—এই অধিকারগুলির পেছনে যে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, রোকেয়া সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ।
তাঁর জীবন আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—পরিবর্তন শুরু হয় একজন মানুষের সাহসী প্রশ্ন থেকে। যে সমাজে মেয়েদের শিক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, সেখানে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে সমাজে নারীর কণ্ঠকে অবদমিত করা হতো, সেখানে তিনি কলমকে প্রতিবাদের অস্ত্র করেছেন। যে সমাজ নারীর ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করে দিতে চাইত, সেখানে তিনি নারীকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অধিকার দাবি করেছেন।
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর চিন্তার মৃত্যু হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। আজও যখন কোথাও মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত, বাল্যবিবাহ বা সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অসমতা দেখা যায়, তখন রোকেয়ার চিন্তা আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে শেখায়।
সবশেষে বলা যায়, বেগম রোকেয়া ছিলেন একাধারে শিক্ষিকা, লেখিকা, সংগঠক ও সমাজসংস্কারক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন নারীমুক্তির এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, নারীকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে পারলে সমাজের অন্ধকার দূর হবে। তাঁর বিদ্যালয় ছিল সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ, তাঁর সাহিত্য ছিল তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশ, আর তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ড ছিল তার কর্মময় প্রয়োগ।
বাংলার সমাজজাগরণের ইতিহাসে তাই বেগম রোকেয়ার নাম শুধু শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার নয়; তাঁর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব। নারীশিক্ষা, মানবিক মর্যাদা, যুক্তিবাদ, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক সাম্যের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আজও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। তাই রোকেয়া অতীতের কোনো স্মৃতিমাত্র নন—তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক জীবন্ত প্রেরণা।
(আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।