মার্কিন কবির পরশে বাংলা কবিতার নবজন্ম

সুবোধ সরকার   ১৯৯২ বাঙালির যেমন একজন বাঙালি লোরকা আছেন, বাঙালি নেরুদা আছেন, বাঙালি বোদলেয়ার আছেন, তেমন বাঙালির একজন অ্যালেন গিন্সবার্গ আছেন। আমি সদ্য কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় এসেছি। বহিরাগত। সারা....

সুবোধ সরকার

 

১৯৯২ বাঙালির যেমন একজন বাঙালি লোরকা আছেন, বাঙালি নেরুদা আছেন, বাঙালি বোদলেয়ার আছেন, তেমন বাঙালির একজন অ্যালেন গিন্সবার্গ আছেন।

আমি সদ্য কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় এসেছি। বহিরাগত। সারা গায়ে চর্যাপদের ধুলো। কলকাতায় ঢোকার কোনও পাসপোর্ট ছিল না— ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ নামে একটি দুর্বোধ্যতম কবিতার বই লিখেছিলাম, সেটাই ছিল গেটপাস। আমেরিকান সেন্টারে গিয়ে বললাম, আমি গিন্সবার্গের ভারত নিয়ে কাজ করছি। শুনে বলল, ‘ওরে বাবা, গিন্সবার্গ ইজ় আ ডেঞ্জারাস আইকন।’ ওরা সব কাগজ দেখল। সব দায়িত্ব নেবে। কিন্তু দেখা করিয়ে দিতে পারবে না। ভারত সরকারের সংস্কৃতি সচিব, কবি অশোক বাজপেয়ী আমাকে বিমানে ওঠার ব্যবস্থা করে দিলেন। হাতে নিলাম সবচেয়ে জরুরি ছোট্ট একটা চিরকুট। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা। চিরকুটে শুধু চাকরি নয়, গিন্সবার্গও হতো।

জীবনে প্রথমবার বিমানে উঠে বাগডোগরা কিংবা আগরতলা না নেমে আমি নামলাম নিউ ইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে। চর্যাপদের ধুলোর কী সাহস! আমার গরিব মা বলেছিলেন, ‘পেছনে নেই চাম/ হরে কেষ্টর নাম।’ বিমানে বসে হাতব্যাগের ভেতর চিঁড়ের প্যাকেটে হাত রেখে ভগবানকে ডাকলাম। ভগবানের নাম অ্যালেন গিন্সবার্গ। জেএফকে থেকে বেরিয়ে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে এগোচ্ছি, দেখি গ্রিক নায়কের মতো এক সুপুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন, জীবনানন্দের অসামান্য অনুবাদক, লেখক অধ্যাপক কল্যাণ রায়। ধড়ে প্রাণ পেলাম। তখনও তাঁর ভারতবিখ্যাত অপর্ণা সেনের সঙ্গে বিয়ে হয়নি। কয়েক দিন কল্যাণদার কাছে থেকে স্নেহে চাঙ্গা হয়ে, প্রশিক্ষণ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ম্যানহাটনে। এলাম গিন্সবার্গের ছোট্ট ফ্ল্যাটে।

হোয়াইট হাউস যাঁকে ভয় পায়, প্রাগ শহর থেকে তাঁকে বিপজ্জনক বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল কমিউনিস্ট সরকার। কিন্তু কলকাতার সুনীল-শক্তিরা তাঁকে মাথায় তুলে কফি হাউস থেকে নিমতলা শ্মশান চষে বেড়িয়েছে। কৃত্তিবাস-এর কবিরা যে উচ্চতায় বসিয়েছিল অ্যালেনকে, আগে কোনও আমেরিকার জীবন্ত কবিকে কলকাতা অত বড় জায়গা দেয়নি।

ঘরে ঢুকে একটা ডিভানের ওপর বসলাম। শালিক পাখির মতো একটা চাইনিজ় ছেলে আমাকে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বোঝাল, চুপ করে বসতে। আমি দেখতে পেলাম, গিন্সবার্গ একটা ছোট কালী মূর্তির সামনে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। আর একটা কোনায় দেখতে পেলাম একটা ছোট হারমোনিয়াম। পাক্কা ২০ মিনিট বাদে তিনি উঠলেন। আমাকে একটা বাতাসা দিলেন। চাইনিজ় ছেলেটিকে দিলেন। নিজে একটি নিলেন। তার পর বললেন, ‘কালী গোজ় টু চায়না, কালী গোজ় টু আমেরিকা।’ আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখে বাতাসা পুরে দিয়ে বললেন, ‘অ্যান্ড কালী গোজ় ব্যাক টু ইন্ডিয়া।’ আমি কলকাতা থেকে গিন্সবার্গের জন্য একটা উপহার নিয়ে এসেছি। সেটা বার করে দিলাম— একতারা হাতে এক বাউল। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললাম, ‘তুমি যে ছ’টা বাউল কবিতা লিখেছ, তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে এই উপহার।’ চোখ দুটো বড় করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমার বাউল কবিতা পড়েছ? কেউ পড়েনি। ইউ আর কিডিং।’ ঈষৎ অপমানিত হয়ে আমি বলতে শুরু করলাম, মুখস্থই ছিল— ‘Baul of Bengal, I sing for all/ Blue Daniub is my Jamuna, Hudson my Vrindavan/ See me in Calcutta, Toronto and London/ Hear my call, Baul of Bengal.’ এই বার আমাকে বেশ জোরে জড়িয়ে ধরলেন। আমি হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠলাম, তিনি সমকামী, যিনি ’৬২ সালে কলকাতায় পা দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন ‘মিট পিটার, মাই ওয়াইফ’। একটা জ্যান্ত পুরুষমানুষকে কেউ নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, এটা ছিল তখনকার কলকাতার পক্ষে একটা বিরাট ধাক্কা। এখনও। হয়তো এখন আরও বেশি। যা-ই বলুক সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবিত্ত বাঙালি বাবু, যদি বাবু বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে, এখন আরও বেশি কূপমণ্ডূক। অষ্টমীতে আমিষ-নিরামিষ নিয়ে বাঙালি ডুবে আছে। গিন্সবার্গ সুনীলদার চিরকুট পড়ে মাথা নেড়ে জানতে চাইলেন, ‘সুনীল ইজ় গুড, হাউ ইজ় শক্তি?’ আমি আসার আগে শক্তিদার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যে দিন দেখা করি, সে দিন লক্ষ করেছিলাম শক্তিদার হাতটা কাঁপছে, যে হাত দিয়ে কবিতা লিখে আকাশ থেকে চাঁদ নামিয়েছেন মাটিতে, সে হাত কাঁপছে, হাতে কাগজ নিলে আরও বেশি কাঁপছে, আমি সেটাই বললাম। শুনে একটা অদ্ভুত কথা বললেন: ‘মদ সিগারেট ছেড়ে দিতে বলো, ও যেন গাঁজা খায় আমার মতো।’ আমি গাঁজা খেয়ে দেখিনি কখনও, কিছু বলতে পারব না, তাই চুপ করে রইলাম।

চার দিন বাদে ফিলাডেলফিয়া। গাড়ি চালাচ্ছেন বব রোজ়েনথাল। পাশে জ্যাক। পেছনে আমি আর অ্যালেন। দু’ঘণ্টার পথ, সারাক্ষণ একা কথা বলে গেলেন। বব গাড়ি চালাতে চালাতে হুঁ-হাঁ করছেন, তাঁকে সব খেয়াল রাখতে হয়, শুধু গাড়ি চালালেই হয় না, প্রতিটা খুঁটিনাটি মনে রাখতে হয়, কেননা তিনি গিন্সবার্গের বিবলিয়োগ্রাফার। এই বব আমাকে একটা দুর্লভ ছবি দেখিয়েছেন, রাসবিহারীর মোড়ে মধ্যরাতে অ্যালেন নগ্ন দাঁড়িয়ে আছেন। আজ পর্যন্ত অপ্রকাশিত। টাইমস স্কোয়্যারে ৪০ তলার একটি ঘরে অ্যালেন সম্পর্কিত একটি অফিস আছে, বব সেখানে আমাকে ডেকে দেখিয়েছেন, কিন্তু কোনও প্রতিলিপি দেননি। গাড়ির পেছনে বসে অ্যালেন আমাকে হঠাৎ বললেন, ‘কই দেখি তোমার কবিতা?’ আবার হাঁটু কাঁপতে লাগল, ভয়ে ভয়ে আমার ইংরেজি অনুবাদের একটি বই বার করে তাঁকে দিলাম। বইটি ইংরেজি ভাষার কবি শর্মিলা রায় ও চিত্রকর সুধাংশু মিলে অরূপ রায়ের আর্ট গ্যালারি থেকে বার করে দিয়েছিলেন। ছোট্ট বইটি হাতে নিয়ে চুপ করে গেলেন অ্যালেন, তীব্র বেগে গাড়ি ছুটে চলেছে, তিনি মন দিয়ে একটার পর একটা কবিতা পড়ে চলেছেন, আমি অপেক্ষা করছি কতক্ষণে একটি থাপ্পড় এসে পড়বে আমার গালে। তা পড়ুক, সেটাও সম্মান। শেষ করে বললেন, ‘তোমার এই দুটো কবিতা’, বলে দুটো কবিতা দেখালেন, ‘এই দুটো কবিতা তুমি নিউ ইয়র্কে আমার সঙ্গে মঞ্চে উঠে পড়বে।’ এত বড় চাঁদ কি আমার হাতে সইবে? ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ অ্যালেন।’ ফিলাডেলফিয়াতে অ্যালেনের একক কবিতাপাঠ। টিকিট কেটে লোকে লাইন দিয়ে ঢুকছে। গাড়ি থেকে নামতেই মব ঘিরে ধরল। গাড়ি থেকে নামল সেই ছোট্ট হারমোনিয়াম, গলায় ঝুলিয়ে অ্যালেন কবিতা পড়তে শুরু করলেন, সঙ্গে বাজতে লাগল হারমোনিয়াম। পড়তে শুরু করলেন তাঁর পৃথিবীবিখ্যাত (‘কুখ্যাত’) কবিতা ‘হাউল’, যে কবিতা লেখার জন্য আমেরিকা তাঁকে আদালতে দাঁড় করিয়েছে, অশ্লীলতার দায়ে। কাকে বলে অশ্লীলতা? আসলে হোয়াইট হাউসের বিরোধিতা, আমেরিকার যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা, পুঁজিবাদকে ধিক্কার দেওয়া এই কবিতা তখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে, মিলিয়ন কপি ছাড়িয়ে গেল তার বিক্রি, আর কোনও মার্কিন কবিতা এত বিক্রি হয়নি। ছয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে তখন ছাত্র অধ্যাপকদের মুখে মুখে ঘুরছে: ‘আই স দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন ডেসট্রয়েড বাই ম্যাডনেস/ স্টারভিং হিস্টেরিক্যাল নেকেড।’ এই ম্যাডনেস, এই হিস্টিরিয়াকে তিনি শান্ত করতে হরিদ্বার হয়ে বেনারস হয়ে কলকাতার গলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার বর্ণনা রয়েছে ‘ইন্ডিয়ান জার্নালস’-এ। মেডিটেশন করেছেন। গরিব জীবনযাপন করেছেন। পাতি হোটেলে বসে সাবানজল দিয়ে পাজামা কেচেছেন। শ্মশানে মৃতদেহর চিতার পাশে বসে গাঁজা খেয়ে দেখেছেন। রাতের পর রাত ভগবদ্গীতা উচ্চারণ করেছেন। নিয়মিত ভাবে সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছে পাঠ নিয়েছেন। তিনি হাড়ে-মজ্জায় ভারতের আত্মাকে আত্তীকরণ করতে চেয়েছেন। ফিলাডেলফিয়ার মঞ্চে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন। পেছন থেকে ‘হাউল, হাউল’ বলে চিৎকারধ্বনি শোনা গেল। এক ঘণ্টা ধরে কবিতা পড়ে গলা থেকে খুলে রাখলেন হারমোনিয়াম। পিন পতনের নীরবতা কাটিয়ে উঠে আসতে লাগল একটার পর একটা প্রশ্ন, অ্যালেন হাসি মুখে সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। একটা প্রশ্ন আজও আমার মনে আছে, এক ছোকরা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘অ্যালেন, তুমি তখন ছিলে অ্যাংরি ইয়ং ম্যান, ক্যাপিটালিজ়মের বিরুদ্ধে, তুমি লিখেছিলে ‘এভরি সেলর, ইউ গো রেপ আওয়ার উইমেন। তুমি এখন প্রতিষ্ঠিত আইকন, গ্লোবাল আইকন, তুমি কি এখনও একই পরামর্শ দেবে নাবিকদের?’ অ্যালেন প্রশ্নটা শুনে হাসলেন, একটু থামলেন, তার পর মাইকটা মুখের কাছে নিয়ে বললেন, ‘নাবিকদের একই পরামর্শ দেব, তবে তাদের জন্মনিরোধক ব্যবহার করতে বলব।’ ভরা প্রেক্ষাগৃহে মনে হলো আটলান্টিক ঢুকে পড়েছে।

২০২৬— হার্ভার্ড

৩৪ বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি। খুঁজে বেড়িয়েছি, কলকাতা তাঁকে কতটা পাল্টে দিতে পেরেছিল। সত্যিই কি ভগবদ্গীতা তাঁকে নতুন মানুষ হতে বলেছিল? নোবেল পুরস্কার পাওয়া কবিতায় তিনবার ‘শান্তি’ লিখেছিলেন যে কবি, তাঁর জন্য ভারতীয় আত্মার প্রয়োজন হয় না। ২০০ বছর ধরে সাদা সাহেবরা কলকাতায় এসেছেন, চলে গেছেন, একটা-দুটো বই লিখেছেন, ভারতবিদ হিসেবে থেকে গেছেন। কিন্তু কী এমন ঘটল যে, একজন কবির কবিতা পাল্টে গেল, আর তাঁর কবিতা পাল্টে দিলো বাংলা কবিতাকে? ভারত গিন্সবার্গকে কতটা পাল্টে দিয়েছিল? কতটা গিন্সবার্গ পাল্টে দিয়েছিলেন বাংলা কবিতাকে? এই নিয়ে ৩৪ বছর ধরে একটা বই লিখতে চেয়েছি, এখনও পারিনি।

 

এই যে বোথ-ওয়ে ট্র্যাফিক, আগে ঘটেনি, না বাংলা, না মার্কিন কবিতায়। ৫০ দশকের বাংলা কবিতা সুনীল-শক্তির হাত ধরে পাল্টে গেল, তার পেছনে অ্যালেন গিন্সবার্গের দুঃসাহসী বেপরোয়া বিপজ্জনক জীবন যাপন এবং আরও দুঃসাহসী কবিতার শৈলী কাজ করেনি? ’৬২ সালের পর বাংলা কবিতা যে ভাবে যে গনগনে উচ্চতায় উঠে দাঁড়ালো, তাকে বাংলা কবিতার নবজন্ম বলা যায়। কবিতার ভাষা পাল্টে গেল, বিন্যাস পাল্টে গেল, কমা সেমিকোলন পাল্টে গেল, হাংরি জেনারেশন উঠে এল, বাংলা কবিতার সবচেয়ে বড় বিপ্লব, যার জেরে বাংলা কবিতাকে গিয়ে দাঁড়াতে হলো কলকাতার হাইকোর্টে, কবি মলয় রায়চৌধুরীকে দেখা গেল এজলাসে। ঠিক যেমন গিন্সবার্গকে দাঁড়াতে হয়েছিল স্যানফ্রান্সিসকোর কাঠগড়ায়। মার্কিন সংস্কৃতি ছুঁয়ে চুঁইয়ে নেমে এল বাংলা কবিতা। যেন গিন্সবার্গ সেই পরাগ মিলনের পরিব্রাজক। অন্য দিকে, বীরভূমের এক বাউলের আখড়া থেকে আর এক আখড়ায় দিনের পর দিন পড়ে থাকা গিন্সবার্গকে নতুন চৈতন্যের দিকে ধাবিত করতে লাগলেন শক্তি আর সুনীল। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে— এই যে স্বপ্ন একজন আমাদের দেখিয়েছিলেন, তা যেন নিমতলা শ্মশান থেকে বীরভূমের আখড়া পর্যন্ত হয়ে উঠল একটি হিরণ্ময় ল্যাবরেটরি, যার ভেতর বসে বাংলা ও মার্কিন কবিতা নিজের নিজের ডিএনএ পাল্টে দিতে লাগল। একটা উদাহরণ দিই। কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে অ্যালেন একটি মারাত্মক কবিতা লিখলেন, তার দু’টি লাইন— ‘হোল্ডিং মাই কক টু পি / আটলান্টিক গাশেস আউট’। মানে কী? শুধুই অশ্লীলতা? অ্যালেন নিজে লিখছেন, ‘ইস্ট কোস্টে থাকতে থাকতে বুঝতে পারি আটলান্টিকের জল টেনে নিচ্ছে মেঘ এবং নেমে আসছে বৃষ্টি, তৈরি হচ্ছে শস্য, আমি সেই শস্য আহার করে জল পান করে আমার ‘কক’ দিয়ে বের করে আনছি দুরন্ত আটলান্টিক’। এর পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেন স্ট্যাচু অব লিবার্টির মাথায় দাঁড়িয়ে বলছেন ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’। অ্যালেনের ব্যাখ্যা একই সঙ্গে আক্ষরিক এবং নৈসর্গিক, বললেন বাউল থেকে আমি এটাই শিখেছি। এ ভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘হাউল’ থেকে ‘বাউল’।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্প্যারেটিভের অধ্যাপক স্পেনসর লেনফিল্ড এবং ভারত ইতিহাসবিদ সুগত বসুর সভাপতিত্বে অ্যালেনের শতবর্ষে যখন অ্যালেনের ভারত নিয়ে বলতে শুরু করলাম, তখন আমার ভেতরে জমে থাকা চৌত্রিশ বছরের চোখের জল বেরিয়ে আসতে চাইছিল। মায়ের কথাটা মনে পড়ছে। হার্ভার্ডের বেকার সেন্টারের বাইরে ড্রাম বাজিয়ে ছাত্র বিক্ষোভ চলছে, বক্তৃতা শুরু হতেই থেমে গেল, তারাও যেন অ্যালেনের মতো বলছে, ‘আমেরিকা, হোয়েন উইল ইয়ু বি এঞ্জেলিক, আমেরিকা তুমি কবে ভালো হবে?’ যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীকে গিন্সবার্গের কবিতাও পাল্টাতে পারেনি। তবু তিনি সভ্যতার এ পার থেকে ও পারে একটি নৌকো নিয়ে বাউল গান গাইতে গাইতে সভ্যতা পার হয়ে চলেছেন। আর ধানখেতে দাঁড়িয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নীরাকে বলছেন ‘হলুদ শাড়ি আর পরো না, এ বারের মাঠে হলুদ ধান ফলেনি’।