অনিমেষ দত্ত
যে চায়ের জন্য দার্জিলিংয়ের জগৎজোড়া খ্যাতি, সেই চায়ের রপ্তানি গত এক দশকে ব্যাপক হারে কমেছে। সম্প্রতি এমনই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে ভারতীয় চা-পর্ষদ (টি-বোর্ড)। তথ্য বলছে, ২০১৫-তে প্রায় ৪০ লক্ষ কিলোগ্রাম দার্জিলিং চা রপ্তানি হয়েছিল গোটা বিশ্বে। ২০২৫-এ রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১.৫০ লক্ষ কেজিতে। মাত্র এক দশকে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির দার্জিলিং চা মূলত রপ্তানির উপরেই নির্ভরশীল। এই অবস্থায় এতটা পরিমাণ রপ্তানি কমায় অশনি সঙ্কেত দেখছেন চা-শিল্পমহলের একাংশ।
চা-পর্ষদের তথ্য বলছে, ২০১৬-তে দার্জিলিং চা রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৩০.৮ লক্ষ কেজি। ২০১৭-তে রপ্তানির পরিমাণ এক লাফে কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ লক্ষ কেজিতে। চা ব্যবসায়ীদের দাবি, সেই সময়ে তীব্র গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের কারণে প্রায় তিন মাস পাহাড়ের সমস্ত চা-বাগান বন্ধ ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চা-বাণিজ্যে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ রপ্তানি সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ, ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় বেশ কিছু পুরোনো ক্রেতা হারাতে হয়। সেই জায়গায় ঢুকে পড়ে নেপাল, কেনিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি।
এরপরে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হয়। ২০১৮-তে রপ্তানি বেড়ে হয় প্রায় ৩৭ লক্ষ কেজি। পরের বছর রপ্তানি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩৩.২ লক্ষ কেজিতে। কোভিড অতিমারির সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ফের রপ্তানি কমে। ২০২৩-এ প্রায় ২৫ লক্ষ কেজি রপ্তানি হয়। পরের বছর কিছুটা বেড়ে প্রায় ২৯ লক্ষ কেজি দার্জিলিং চা রপ্তানি হলেও ২০২৫-এ তা ফের নেমে দাঁড়ায় ২১.১৫ লক্ষ কেজিতে। গত ১১ বছরের নিরিখে যা সব থেকে কম।
রপ্তানি কমার প্রভাব পড়ে উৎপাদনেও। ২০১৫-তে প্রায় ৮০.৮ লক্ষ কেজি দার্জিলিং চা উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫-এ সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ লক্ষ কেজিতে। ১০ বছরে প্রায় ৩৫ শতাংশ উৎপাদন কমে যাওয়া যে কোনও ইন্ডাস্ট্রির পক্ষেই অশনি সঙ্কেত। রপ্তানির পাশাপাশি উৎপাদন কমার পিছনেও উঠে আসছে নানা কারণ। চা বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে বিনিয়োগে মালিকপক্ষের উদাসীনতা, শ্রমিকদের ব্যাপক অনুপস্থিতি এবং কিছুটা জলবায়ু পরিবর্তন জগদ্বিখ্যাত দার্জিলিং চায়ের উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। খাতায়কলমে পাহাড়ে মোট ৮৭টি চা-বাগান সচল থাকলেও বাস্তবে এর মধ্যে অন্তত ১০টি ধুঁকছে। সেগুলি আগামী দিনে বন্ধ হয়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
টেরাই ইন্ডিয়ান প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টিপা) চেয়ারম্যান মহেন্দ্র বনসল এই সমস্যার পিছনে সরকারি উদাসীনতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘আগে টি-বোর্ডের তরফে নানা ধরনের ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কোভিডের পর থেকে সেসব তুলে দেওয়া হয়েছে। এক দিকে শ্রমিকরা বেতন বাড়ছে না বলে প্ল্যান্টেশন–এর কাজ ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন, অন্য দিকে সরকার দার্জিলিংয়ের হেরিটেজ প্ল্যান্টেশন–এর দিকে সে ভাবে নজর না দেওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।’ তাঁর মতে, উৎপাদন তখনই বাড়ানো যায়, যখন পর্যাপ্ত শ্রমিক থাকে, বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। এগুলির কোনওটাই না হওয়ায় তার প্রভাব রপ্তানিতেও পড়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ৫৪ হাজার স্থায়ী এবং ২০ হাজারের কাছাকাছি অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন দার্জিলিংয়ের চা-বাগানগুলিতে। তাঁদেরও পরিবার রয়েছে। চায়ের রপ্তানি যত কমবে, তত শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন কিংবা বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরির আশঙ্কাও বাড়বে। গত এক দশকে এমন একাধিক ঘটনাও সামনে এসেছে। চলতি বছরে উৎপাদন এবং রপ্তানির হিসেব কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এখনও জানা নেই। তবে যে ভাবে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনে বিশ্ববাজারে দার্জিলিং চায়ের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।