বাঙালি ভুক্তভোগী, না কি আদতে শুক্তোভোগী!

দেবার্ঘ্য ভট্টাচার্য্য   শুক্তো দীপঙ্কর দাশগুপ্ত ‘ছি-ছি-ছি-ছি রানি রাঁধতে শেখেনি! জ্যাঠাইমাকে বলে, ঝোলে মশলা দেব কি? শুক্তানিতে ঝাল দিয়েছে, অম্বলেতে ঘি!’ শুক্তোর এমনই মহিমা। রান্নাবাটি খেলার নিখাদ বালিকাবেলায় শুক্তো নামের....

দেবার্ঘ্য ভট্টাচার্য্য

 

শুক্তো

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

‘ছি-ছি-ছি-ছি
রানি রাঁধতে শেখেনি!
জ্যাঠাইমাকে বলে,
ঝোলে মশলা দেব কি?
শুক্তানিতে ঝাল দিয়েছে,
অম্বলেতে ঘি!’

শুক্তোর এমনই মহিমা। রান্নাবাটি খেলার নিখাদ বালিকাবেলায় শুক্তো নামের সঙ্গে তো এভাবেই প্রথম পরিচয়। আর সেই সেকালের শিশুপাঠ্য ছড়ায় তার উল্লেখ বুঝিয়ে দেয় পারিবারিক জীবনে রান্নাটির গুরুত্বের কথা। শুক্তো রান্না ব্যাপারটা যে মোটেই সোজা নয় সেটি বোঝাতে সুরসিক সাহিত্যিক  সৈয়দ মুজতবা আলি তাই বলেছিলেন, বাঙালি রান্নায় কে কত বড় ওস্তাদ জানা যায় শুক্তোর স্বাদ দিয়ে।

শুক্তো মানে তেতো তরকারি। বাংলার আহারে তেতো খাওয়ার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। শুক্তো শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শুষ্ক তিক্ত পত্র থেকে। খনার বচনে আছে, ‘আগে তিতা পরে মিঠা’। আরম্ভে তেতো, শেষে মিষ্টি। তেতো খেলে রুচি বাড়ে। বাঙালি হেঁশেলে পর্তুগিজ প্রভাব পড়ার আগে থেকেই শুক্তোর আবির্ভাব। সুশ্রুত, চরক ও ধন্বন্তরীর মতো আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ঋষিরা তেতোর অসীম উপকারিতার কথা বলে গিয়েছেন। শরীর স্বাস্থ্যের পক্ষে শুধু উপকারিই তো নয়, উপযুক্ত সবজি, মশলা, ফোড়ন ও রান্নার রসায়নে তেতোর ভারসাম্য পৌঁছে যায় এমন এক মাত্রায় যে পদটি হয়ে ওঠে পরম সুস্বাদু। বাঙালির পালা-পার্বন, উৎসব অনুষ্ঠানের খাদ্য সম্ভারে মাছের কালিয়া, কষা মাংস, সন্দেশ-রসগোল্লার শুরুতে তাই শুক্তোর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তেতো হলেও শুক্তো সেখানে শুভ। মানতেই হবে শুক্তো হল বাঙালি পাকশালার মৌলিক অবদান। হাতের গুণ ও রান্নার বোধে উত্তীর্ণ এই সরল পদটি খাওয়ার স্পৃহা বাড়ায়। বাংলার ভৌগলিক সীমা পরিবর্তিত হওয়ার আগে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে শুক্তোর মেলবন্ধন।

শুধু উৎসবে নয়, সাদামাঠা রোজের জীবনযাপনেও তিক্ত স্বাদে পরিতৃপ্তির সন্ধান। মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রাকৃত-পৈঙ্গলের সেই বহু-ব্যবহৃত কবিতায় বাঙালির বাস্তব জীবনের কিছু হদিস পাওয়া যায়। সে হল খাঁটি বাঙালি পুণ্যবানের ছবি —

‘ওগ গর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুত্তা
মোইলি মচ্ছা নালিচ গচ্ছা দিজ্জই কন্তা খা (ই) পুনবন্তা’

অর্থাৎ কলাপাতায় স্ত্রীর বেড়ে দেওয়া গরম ফেনাভাত, গাওয়া ঘি, গরম দুধ, মৌরলা মাছ আর নালিতা বা পাটশাক যে খায় সে পুণ্যবান। পাটশাক তেতো। সুজলা সুফলা এই বাংলায় সাধারণ মানুষের প্রিয় ছিল শাক-ভাত। নানা ধরনের শাক। নিরন্ন পৃথিবীতে খাদ্য হিসেবে শাক রূপে আবির্ভুতা হয়েছিলেন দেবী শাকম্ভরী। মহামায়া দুর্গার এক রূপ। শাকের মতোই সবুজ রং তাঁর। সেই শাক সংগ্রহ করার বিশদ বিবরণ রয়েছে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে —

‘নটে রাঙ্গা তোলে শাক পালঙ্গ নালিতা
তিক্ত পলতার শাক কলতা পলতা।’

খাওয়াদাওয়ার কথা বলার সুযোগ পেলে বাঙালি কোনও কালেই ছাড়েনি। মঙ্গলকাব্যে কবিকঙ্কনের মতো কবিরাও সেই সুযোগ সানন্দে কাজে লাগিয়েছেন। চণ্ডীমঙ্গলে পাই, খুল্লনা তার সতীত্বের পরীক্ষা দেওয়ার পরে এবং ধনপতির সিংহল যাত্রার আগে আত্মীয়-কুটুম্ব, স্বজন-বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের খাওয়ানোর জন্য এলাহি আয়োজন। ঘিয়ে ভাজা পটোল থেকে শুরু করে আদার রস দিয়ে কই মাছ ভাজা, মাংস সহ পঞ্চাশ রকম ব্যঞ্জন রান্না করছেন খুল্লনা। তার মধ্যে শুক্তো আর শাক অন্যতম। সোনার থালায় ভাত বেড়ে, সোনার ঘটি থেকে পাতে ঘি দিয়ে নানা ব্যঞ্জন সাজিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়েছে। খুল্লনার হাতের রান্না খেয়ে সকলে মুগ্ধ —

‘ভোজন করিল যত জ্ঞাতি বন্ধু জন।
খুল্লনা কনক থালে যোগায় ওদোন।।…
প্রথমে শুক্তার ঝোল দিল ঘন্ট শাক।
প্রশংসা করেন সবে ব্যঞ্জনের পাক।।

সেই শুক্তো রান্নার পদ্ধতিও আমরা জানতে পারি। ওই ‘ব্যঞ্জনের পাকে’ই স্বাদের রহস্য —

‘বেগুন কুমড়া কড়া, কাঁচকলা দিয়া শাড়া
বেসন পিটালী ঘন কাঠি।
ঘৃতে সন্তলিল তথি, হিঙ্গু জীরা দিয়া মেথী
শুক্তা রন্ধন পরিপাটী।।’

আবার ধনপতি সদাগর সিংহল যাত্রার জন্যে বিভিন্ন স্থানীয় পণ্য বোঝাই করে তাঁর ‘মধুকর’ সাজাতে গিয়ে মনে মনে রঙিন স্বপ্নের জাল বুনছেন, কানাকড়ি মূল্যের এই সব দেশজ পণ্যের বিনিময়ে তিনি মহার্ঘ বিদেশি পণ্য সওদা করে ফিরবেন। সেখানেও এসে পড়ে শুক্তোর তুলনা — ‘শুকুতার বদলে মুকুতা পাব’।

নারায়ণ দেবের ‘পদ্মাপুরাণে’ বেহুলার বিবাহের ভোজে ‘সুখত’ অর্থাৎ শুক্তো রান্না হয়েছে বেতের আগা, পাটশাক, ঘিয়ে ভাজা হেলেঞ্চা, লাউয়ের ডগা, মুগ ডাল, মুগ ডালের বড়ি, তিল বড়া, তিল কুমড়ো, সিঙ্গাড়ি, মউয়া আলু, পলতার শাক আর আদা বাটা দিয়ে। মঙ্গলকাব্যের একটি উপাখ্যানে দেখি, শিব শুক্তো রাঁধতে বলছেন অন্নপূর্ণাকে।

মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব এবং ভক্তি আন্দোলনে নিরামিষ ব্যঞ্জনের জনপ্রিয়তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে’র বিবরণ অনুযায়ী শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য পরম সমাদরে শ্রীচৈতন্যকে আপ্যায়ন করেছিলেন তাঁর প্রিয় নিরামিষ তরকারি ও নানা মিষ্টান্নের সম্ভারে রুপোর থালা সাজিয়ে।

‘চই-মরিচ, সূক্তা দিয়া সব ফলমূলে।
অমৃতনিন্দক পঞ্চবিধ তিক্ত ঝালে।।
কোমল নিম্বপত্র সহ ভাজা বার্তাকী।
পটোল ফুলবড়ি ভাজা কুষ্মাণ্ড মানচাকী।।’

বসন্তকালে শরীরের পক্ষে উপকারি কচি নিমপাতা সহ বেগুনভাজার সঙ্গে রয়েছে শুক্তো এবং পটোল, কুমড়ো ও মানকচু ভাজা। আবার পুরীতে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়িতে শ্রীচৈতন্যদেব যে নিরামিষ পদ খেয়েছিলেন তারও বর্ণনা রয়েছে ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে’ — ‘দশবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল’।

এই সবই ঘটেছে পর্তুগিজ হার্মাদরা সুলতানি বঙ্গে হানা দেওয়ার আগে। কাজেই এমনটা ভাবলেও সম্ভবত অযৌক্তিক হবে না যে বাঙালি সমাজে ক্রমশ মেলামেশার ফলে পর্তুগিজরা শুক্তো রান্নার রেসিপি বাংলার হেঁশেল থেকেই বরং চালান করেছে নিজের দেশে। তবে কালের সঙ্গে বাঙালির হেঁশেলেও শুক্তো রান্নায় রকমফের ঘটেছে এবং অঞ্চল ও পরিবার ভেদে সেই বিবর্তন আজও ঘটে চলেছে। শুক্তোতে কাঁচা পেঁপে, সজনে ডাঁটা, রাঙা আলু কিন্তু পরবর্তীকালের সংযোজন। এগুলির মধ্যে সজনের উৎস ভারতে হলেও রাঙা আলু ও পেঁপে পর্তুগিজ আমদানি। ঘিয়ের বদলে সর্ষের তেল, বিউলির ডালের বড়ি, রাঁধুনি ফোড়ন এবং চালের গুঁড়ো, আটা বা ময়দা এবং স্বাদ মতো চিনি অল্প দুধে গুলে সেই পিটালি শুক্তোয় দিয়ে স্বাদ বাড়ানোর কৌশল বাঙালি রপ্ত করেছে নিজস্ব অভিজ্ঞতায়।

লক্ষণীয়, একালের শুক্তোতে যে বস্তুটি অপরিহার্য সেই উচ্ছে বা করলার উল্লেখ কিন্তু আমরা মঙ্গলকাব্য বা মধ্যযুগের সাহিত্যে দেখছি না। খুল্লনা শুক্তো রাঁধলেন বেগুন, কুমড়ো, কাঁচকলা আর হিং, জিরা ও মেথি ফোড়ন দিয়ে। সেখানে তেতো কোথায়? রাঁধুনি, সর্ষে বা পোস্তবাটাও নেই। বরং বেহুলার বিবাহের শুক্তো রান্নায় তেতো একাধিক — পাটশাক, হেলেঞ্চা ও পলতা পাতা। আধুনিক যুগের শুক্তো রান্নায় হিংয়ের চলন নেই। আবার তেতোর বিকল্প কী হতে পারে তার এক কৌতুককর কাহিনী শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী তাঁর ‘জীবনকথা’য়। তাঁর পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল বিলেতে থাকার সময় প্রয়োজনীয় মশলাপাতি না পেয়ে কুইনিন বড়ি ব্যবহার করে শুক্তো রেঁধেছিলেন!

বাংলায় শুক্তো রান্নার উপাদানে যেমন বৈচিত্র্য, তেমনই বাঙালির তেতো খাওয়ারও নানা পদ্ধতি। হিঞ্চে শাক, পাট শাক, গিমা শাক, শিউলি পাতা, নিম পাতা, থানকুনি পাতা, গাঁদাল পাতা, সজনে ফুল কিংবা যুক্তি ফুল দিয়ে শুক্তো, বড়া, ভাজা, বাটা — বাংলার রন্ধনশিল্পের অতুলনীয় সব বৈশিষ্ট্য। শুধু তেতো বলে নয়, প্রতিটি উপাদানের স্বাদ-গন্ধ ও ভেষজ গুণ আলাদা।

তেতো রান্নার বৈশিষ্ট্য ও তার বিবিধ উদ্ভাবনী রন্ধনপ্রণালী ছড়িয়ে আছে পুরনো আমলের রান্নার বইয়ের পাতায় পাতায়। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর  ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইতে ‘শুক্তানি’ অধ্যায়ে অনেক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। পলতা পাতার ডালনায় কখনও পটোল দিতে নেই। পটোল ও পলতা সম্বন্ধে প্রবাদ আছে — ‘মায়ে ছায়ে’ খেতে নেই। অর্থাৎ পলতার সঙ্গে পটোল খাপ খায় না। তাই জননী পলতা ও তার সন্তান পটোল এক সঙ্গে খাওয়া নিষেধ। আবার মশলার ব্যাপারে তাঁর উপদেশ শুক্তোয় হলুদ দিতে হয় খুব সামান্য। সর্ষের ভাগ বেশি। রাঁধুনি বাটা দিলে খুব ভালো। পিটালির জন্যে ময়দা, দুধ ও চিনি। আদা শুক্তানির প্রধান উপকরণ। তিনি ১৩ রকম নিরামিষ শুক্তানির প্রণালী দিয়েছেন। এছাড়া উচ্ছে দিয়ে মসুর ডাল ও সজনে ফুল দিয়ে মসুর ডালের রেসিপি দিয়েছেন। তাঁর একটি পদ হল ‘নিমগুঁড়া’ — শুকনো তাওয়ায় নিমপাতা নেড়েচেড়ে খড়খড়ে করে ভাজতে হবে। তারপরে নুন দিয়ে হামানদিস্তা বা এখন মিক্সিতে গুঁড়ো করে নিয়ে গরম ভাতে খেতে হবে।

শুক্তো প্রধানত নিরামিষ। লাউয়ের বা শশার শুক্তানি তো বিশেষত গ্রীষ্মের দুপুরে দুই বাংলাতেই প্রিয়। তবে পূর্ববঙ্গের বাঙাল ভাষায় শুক্তোর সঙ্গে ধ্বনিসাম্য় আছে এমন একটি পদ ‘শুকোৎ’। সে আবার আমিষ যাতে তেতো নেই। নদী-খাল-বিল অধ্যুষিত সেই ভূখন্ডে পেট ঠান্ডা রাখতে রাঁধুনি, তেজপাতা ফোড়ন ও আদাবাটা আর আলু-পটোল দিয়ে মাছের পাতলা শুকোৎ ঝোল অনেকের কাছে অমৃত। মাগুর, শিঙি, রুই, পাবদা, বাটা বা চারাপোনা দিয়ে শুকোৎ ঝোল চমৎকার হয়। তাতে পেঁপে আর কাঁচকলা দিলেও উপাদেয়। অবিভক্ত বাংলায় রাজশাহী সহ উত্তরবঙ্গের প্রচলিত রন্ধন-প্রণালী উঠে এসেছে দিঘাপতিয়ার জমিদার গিন্নি কিরণলেখা রায়ের ‘বরেন্দ্র রন্ধন’ বইতে। সেখানে তিনি নানারকম তেতো ভাজা, ছেঁচকি, চচ্চড়ি ও শুক্তোর কথা লিখতে গিয়ে বলছেন, বরেন্দ্র রন্ধনশৈলীতে শুক্তোয় জিরা, পাঁচফোড়ন এবং বাটা ঝাল পড়ে না। মেথি, সর্ষে, কখনও রাঁধুনি ও কালোজিরে ফোড়ন পড়ে। নিরামিষ শুক্তোয় হলুদ নামমাত্র। চিনি নয়। একটি আমিষ পদ বেশ ব্যতিক্রমী যাতে তেতো রয়েছে।  সেটি ‘এই সময়’ পাঠকদের জন্য রইল —

করলা দ্বারা মাছের তিত চচ্চড়ি

ভ্যাদা বা মেনি, ল্যাটা, পুঁটি, কই, খলশে বা রুইয়ের চারাপোনা মাছ দিয়ে এই পদটি রাঁধা যায়। মাছ নুন-হলুদ মেখে কষিয়ে রাখতে হবে। বড় বড় করলা একটু লম্বা করে কুটতে হবে। তেলে তেজপাতা, লঙ্কা, মেথি ফোড়ন দিয়ে করলা ছেড়ে সাঁতলাতে হবে। তারপরে মাছ ছেড়ে নেড়েচেড়ে নুন-হলুদ গুলে আন্দাজমতো জল দিতে হবে। শুকিয়ে এলে কাঁচালঙ্কাবাটা ও সর্ষেবাটা একসঙ্গে মিশিয়ে মাছে ঢেলে শুকনো করে নামাতে হবে। ইচ্ছে হলে পেঁয়াজ ফোড়নও দেওয়া চলে।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারের রেণুকা দেবী চৌধুরানী তাঁর ‘রকমারি আমিষ রান্না’ ও ‘রকমারি নিরামিষ রান্না’র বইদুটিতে হেলেঞ্চা সিদ্ধ ও বেতের ডগা সিদ্ধ থেকে শুরু করে আস্ত করলা ভাজা, নিমপাতার পাটভাজা, শিউলিপাতা ও মেথিশাকের বড়ার প্রণালী যেমন দিয়েছেন, তেমনই মেথি, সর্ষে, তেজপাতা, আদাকুচি ফোড়ন দিয়ে ‘উচ্ছে আলুর সর্ষেবাটা ঝোল’ রান্নার পদ্ধতিও শিখিয়েছেন। রয়েছে ‘দই উচ্ছে’ রান্নার প্রণালী। উচ্ছে ভাজা ও সিদ্ধ খেতে খেতে একঘেয়েমি দূর করতে এই দুটি পদ নিশ্চয়ই মুখে রুচি আনবে। এছাড়া আছে তেজপাতা, সর্ষে, শুকনোলঙ্কা ফোড়নে ‘উচ্ছে দিয়ে অড়হর ডাল’ কিংবা তেজপাতা, সর্ষে, শুকনোলঙ্কা ও আদাকুচি ফোড়নে ‘শেফালি পাতা দিয়ে কাঁচামুগ ডাল’।

লীলা মজুমদার তাঁর বিখ্যাত ‘রান্নার বই’তে লিখেছেন, সেকালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাপার বাড়িতে অন্তত চার রকমের ডাল না করলে লোকে নিন্দা করত। তার মধ্যে প্রথমে থাকত আদা-সর্ষে ফোড়ন দিয়ে তেতোর ডাল। তারপর থাকত প্লেন ডাল, নিরামিষ তরকারি দিয়ে ডাল এবং মাছের মুড়ো দিয়ে ডাল। এখনকার নেমন্তন্ন বাড়িতে এই সব কল্পনাও করা যায় না।

ভারত যখন বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’র শিরোপা অর্জন করেছে তখন জীবনশৈলী ঘটিত এইসব রোগ বালাই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমাদের সকলের উচিত খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হওয়া এবং উপকারি উপাদানগুলিকে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় নিয়ম করে রাখা। সেই কারণেই আমাদের আধুনিক জীবনে তেতোর উপযোগিতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। রোজের খাবারের পাতে একঘেয়েমি কাটাতে চাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিত্য নতুন তেতোর পদ। নিমপাতা এবং উচ্ছে ও করলা আমাদের শরীরের ইমিউনিটি বাড়ায়, রক্ত শোধন করে বলে ত্বকের স্বাস্থ্য ফেরে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। লিভারের পক্ষে ভালো বলে হজমে সাহায্য করে। নিমপাতা তো চুল পড়াও রোধ করে বলে অভিমত। এছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, করলা ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে রাখে। করলা তো আজকাল সারা বছর পাওয়া যায়। সুতরাং এত সব গুণ জানার পরে তেতো বলে করলাকে এড়িয়ে যাওয়ার কিন্তু কারণ থাকতে পারে না।

আমরা যদিও তেতো খাই দুপুরে, বাংলাদেশে কিন্তু রাতেও তেতো খাওয়ার চল রয়েছে। সেখানে করলার মধ্যে শুঁটকির পুর ভরে রান্না মাঝি-মাল্লাদের মধ্যে জনপ্রিয়। নানা রান্নার বইতে তেতোর অনেক রেসিপি দেখা যেতে পারে মুখ বদলাতে। এছাড়া ইউটিউবে মিলবে হাগলিকাই চাটনি — কর্ণাটকে প্রিয় করলার চাটনি, মহারাষ্ট্রের কারলিয়াচি ভাজি অর্থাৎ করলা ভাজা কিংবা তামিলদের প্রিয় পাভাক্কাই ভারুভল — সেও একরকম করলা ভাজা। প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় জনপ্রিয় সান্তুলা আর অসমে খার। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেগুলিও পরখ করা যেতে পারে। অন্তত তেতো তো পেটে পড়ুক।
আবার চৈত্র সংক্রান্তিতে নিম পাতা ভাজা খাওয়ার সঙ্গে কোথাও কোথাও জড়িত এক লৌকিক সংস্কার। পুরনো বছরের তিক্ততা যেন চলে যায়। আসন্ন নতুন বছর যেন ভালো কাটে।