রেনেসাঁ সাহিত্য ও মাইকেলের বিদ্রোহী চেতনা

ড. রতন ভট্টাচার্য রেনেসাঁ বা নবজাগরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক যুগান্তকারী মানসিক পরিবর্তনের নাম, যার মধ্য দিয়ে মানুষ মধ্যযুগের অন্ধ আনুগত্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বদ্ধ চিন্তার পরিসর অতিক্রম করে যুক্তি,....

ড. রতন ভট্টাচার্য

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক যুগান্তকারী মানসিক পরিবর্তনের নাম, যার মধ্য দিয়ে মানুষ মধ্যযুগের অন্ধ আনুগত্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বদ্ধ চিন্তার পরিসর অতিক্রম করে যুক্তি, স্বাধীনতা, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার নতুন জগতে প্রবেশ করেছিল। ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ, যুক্তিবাদী মননের উন্মেষ এবং প্রাচীন গ্রিক-রোমান জ্ঞান ও শিল্পের পুনরাবিষ্কার। সাহিত্যেও তার গভীর প্রভাব পড়ে। দান্তে, পেত্রার্ক, বোচ্চাচ্চো, শেক্সপিয়র, মার্লো ও মিল্টনের রচনায় মানুষ, তার প্রেম, সংকট, আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীন সত্তা নতুন মর্যাদা লাভ করে। তাই রেনেসাঁ সাহিত্য কেবল একটি সাহিত্যিক আন্দোলন নয়; এটি মানুষের মুক্তির ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

বাংলা সাহিত্যে উনিশ শতকের নবজাগরণ সেই বৃহত্তর রেনেসাঁ-চেতনারই এক স্বতন্ত্র ভারতীয় রূপ। পাশ্চাত্য শিক্ষা, মুদ্রণযন্ত্র, আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, সমাজসংস্কার এবং নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের ফলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তার সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখের কর্মে। কিন্তু বাংলা কাব্যকে প্রকৃত আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভূমিকা অনন্য। তাঁর জীবন ও সাহিত্য—দুই ক্ষেত্রেই ছিল প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ, নতুনের প্রতি আকর্ষণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

 

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম ১৮২৪ সালে যশোরের সাগরদাঁড়িতে। হিন্দু কলেজে শিক্ষালাভের সময় থেকেই তাঁর মনে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। শেক্সপিয়র, মিল্টন, হোমার, ভার্জিল প্রমুখ কবি তাঁর কল্পনাকে আলোড়িত করেছিলেন। তিনি প্রচলিত জীবনযাত্রা ও সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ, মাদ্রাজে গমন, ইংরেজিতে সাহিত্য রচনার স্বপ্ন, পরবর্তীকালে ইউরোপযাত্রা—সবকিছুতেই তাঁর স্বাধীনচেতা মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর জীবন যেন ঊনবিংশ শতকের বাঙালি সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত এক প্রশ্ন—মানুষ কি কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে, নাকি নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করবে?

 

এই প্রশ্নই তাঁর সাহিত্যিক বিদ্রোহের মূল ভিত্তি। মাইকেলের বিদ্রোহ কখনও নিছক ধ্বংসের বিদ্রোহ নয়; তা ছিল সৃষ্টির বিদ্রোহ। তিনি পুরনো সাহিত্যরীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু তার পরিবর্তে নির্মাণ করেছেন নতুন কাব্যভাষা, নতুন ছন্দ, নতুন নায়ক এবং নতুন নন্দনতত্ত্ব। বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন তাঁর সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদানগুলির একটি। প্রচলিত পয়ার, ত্রিপদী ও অন্ত্যমিলনির্ভর ছন্দের বাইরে এসে তিনি বাংলা কবিতাকে দীর্ঘ শ্বাস, গাম্ভীর্য ও নাটকীয়তার এক নতুন প্রকাশভঙ্গি দিয়েছিলেন। তাঁর হাতে বাংলা ভাষা পেল মহাকাব্যিক উচ্চারণের শক্তি।

 

এই বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। রামায়ণের প্রচলিত আখ্যানকে তিনি এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করেন, যা বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। রামায়ণে রাম নায়ক এবং রাবণ প্রতিপক্ষ; কিন্তু মাইকেল রাবণের পরিবার ও লঙ্কার মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে কাহিনিকে দেখতে চেয়েছেন। মেঘনাদকে তিনি কেবল রাবণের পুত্র হিসেবে দেখেননি; তাঁকে দেখিয়েছেন বীর, দেশপ্রেমিক, কর্তব্যনিষ্ঠ এবং আত্মত্যাগী যুবক হিসেবে। ফলে প্রচলিত ‘নায়ক’ ও ‘খলনায়ক’-এর সরল বিভাজন ভেঙে যায়।

 

এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে রেনেসাঁর মানবতাবাদী চেতনা অত্যন্ত স্পষ্ট। রেনেসাঁ মানুষকে তার সামাজিক পরিচয় বা ধর্মীয় অবস্থানের বাইরে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছিল। মাইকেলও রাবণ বা মেঘনাদকে কেবল ‘অসুর’ বলে বাতিল করেননি; তাঁদের মানবিক গুণ, বেদনা, ভালোবাসা ও বীরত্বকে সামনে এনেছেন। বিশেষ করে মেঘনাদের মৃত্যু শুধু একটি যুদ্ধের ঘটনা নয়; তা হয়ে উঠেছে এক তরুণ বীরের করুণ আত্মত্যাগ। বিজয়ীর ইতিহাসের পাশাপাশি পরাজিতের বেদনার প্রতিও কবির সহানুভূতি এখানে লক্ষণীয়।

 

মাইকেলের বিদ্রোহী চেতনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রমীলা, মন্দোদরী, সীতা প্রভৃতি চরিত্র প্রচলিত পৌরাণিক চরিত্রের একমাত্রিক পুনরাবৃত্তি নয়। তাঁরা প্রেম করেন, দুঃখ পান, সিদ্ধান্ত নেন, প্রতিবাদ করেন এবং নিজেদের অনুভূতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রমীলার মধ্যে আমরা প্রেম ও বীরত্বের এক অসাধারণ সমন্বয় দেখতে পাই। মন্দোদরীর মাতৃত্ব, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশঙ্কা তাঁকে গভীর মানবিক চরিত্রে পরিণত করেছে। নারীর অনুভূতিকে এই মর্যাদা দেওয়াও মাইকেলের মানবতাবাদী মননের পরিচায়ক।

 

মাইকেলের বিদ্রোহ কেবল পুরাণের পুনর্ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ব্যঙ্গনাট্য ‘একেই

কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’-এ তিনি সমকালীন সমাজের ভণ্ডামি

, কৃত্রিমতা ও নৈতিক অবক্ষয়কে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু বাঙালির অন্ধ অনুকরণ, তথাকথিত আধুনিকতার বাহ্যিক চাকচিক্য এবং সামাজিক অসঙ্গতিকে তিনি ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে সভ্যতা পোশাক, ভাষা বা আচরণের অনুকরণ নয়; সভ্যতার প্রকৃত মূল্য মানুষের চিন্তা ও নৈতিকতায়।

 

মাইকেলের সাহিত্যিক আধুনিকতার আরেকটি দিক তাঁর ভাষা। তিনি বাংলা ভাষাকে একদিকে সংস্কৃতনির্ভর গাম্ভীর্য দিয়েছেন, অন্যদিকে পাশ্চাত্য কাব্যরীতির প্রভাবে তার বাক্যগঠন ও প্রকাশভঙ্গিতে নাটকীয়তা এনেছেন। বাংলা কবিতার শব্দভাণ্ডার ও বাক্যপ্রবাহ তাঁর হাতে নতুন শক্তি লাভ করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলা ভাষা কেবল গীতিকবিতা বা ভক্তিমূলক পদাবলির ভাষা নয়; এই ভাষায় মহাকাব্য, ট্র্যাজেডি, ব্যঙ্গ এবং আধুনিক মননের জটিল অভিজ্ঞতাও প্রকাশ করা সম্ভব।

 

তবে মাইকেলের বিদ্রোহের মধ্যে একটি গভীর আত্মসংঘাতও ছিল। পাশ্চাত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যত প্রবল হয়েছে, ততই তাঁর অন্তরে স্বদেশের স্মৃতি জেগেছে। জীবনের শেষ পর্বে তাঁর কবিতায় সেই প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় বিদেশবাসী কবির হৃদয়ে জন্মভূমির জন্য যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বদেশস্মৃতি। তিনি লিখেছিলেন—“সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।” এই একটি পঙ্‌ক্তির মধ্যেই বিদেশে থেকেও বাংলার মাটি, নদী ও শৈশবের প্রতি তাঁর গভীর টান ধরা পড়ে।

 

এই আত্মসংঘাত মাইকেলকে আরও মানবিক করে তোলে। তিনি একদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার দিকে এগিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়কে অস্বীকার করতে পারেননি। তাঁর বিদ্রোহ তাই আত্মপরিচয়ের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান নয়; বরং আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রয়াস। রেনেসাঁর প্রকৃত চেতনার সঙ্গেও এই দ্বন্দ্বের মিল আছে। নবজাগরণ অতীতকে ধ্বংস করে না; বরং অতীতকে নতুন চোখে দেখে, তার মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে।

 

মাইকেলের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেও বাংলা সাহিত্যে নিছক অনুকরণ করেননি। তিনি হোমার, মিল্টন ও শেক্সপিয়রের কাছ থেকে মহাকাব্যিক ও নাটকীয় রীতির শিক্ষা নিয়েছিলেন, কিন্তু ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ হয়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় পুরাণ ও বাংলা ভাষার নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম। তাঁর সাহিত্যিক গ্রহণ ছিল সৃজনশীল আত্মীকরণ। এ কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বড় আধুনিক কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

 

মাইকেলের বিদ্রোহী চেতনা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের আধুনিক কাব্যবোধ, নজরুলের বিদ্রোহী মনন এবং পরবর্তী বাংলা কবিতার মুক্তছন্দের প্রবণতার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাইকেলের প্রবর্তিত আধুনিকতার প্রভাব অনুভূত হয়। বাংলা কবিতায় যে আত্মসচেতন আধুনিক মানুষ পরবর্তীকালে আবির্ভূত হয়েছে, তার পূর্বসূরি মাইকেল। তিনি দেখিয়েছিলেন, কবিকে নিজের যুগের সঙ্গে যেমন কথা বলতে হয়, তেমনি প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলতে হয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য তাই কেবল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি বাঙালির মানসিক আধুনিকতার ইতিহাসও। তাঁর বিদ্রোহ আমাদের শেখায় যে সাহিত্যিক নবজাগরণ শুরু হয় প্রশ্ন করার সাহস থেকে। যে সমাজ নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সাহিত্যরীতিকে প্রশ্ন করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত অর্থে নবজাগরণ লাভ করতে পারে না। মাইকেল সেই প্রশ্নের সাহস দেখিয়েছিলেন। তিনি প্রথার সামনে মাথা নত করেননি; বরং নতুন সৌন্দর্য, নতুন ছন্দ, নতুন নায়ক এবং নতুন মানবিকতার সন্ধান করেছেন।

 

রেনেসাঁর মূলমন্ত্র ছিল মানুষকে তার নিজের শক্তির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে সেই মানবিক স্বাধীনতারই এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর বিদ্রোহে ছিল পাশ্চাত্যের আধুনিকতার আকর্ষণ, তাঁর সৃষ্টিতে ছিল ভারতীয় ঐতিহ্যের পুনর্ব্যাখ্যা, তাঁর কাব্যে ছিল ব্যক্তিমানুষের বেদনা এবং তাঁর ভাষায় ছিল নতুন যুগের গর্জন। তাই মাইকেলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বললে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় ধরা পড়ে না; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁ-মানসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর বিদ্রোহ আসলে ছিল সৃষ্টির জন্য বিদ্রোহ, স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ এবং সাহিত্যের নতুন সম্ভাবনার জন্য বিদ্রোহ। সেই কারণেই বাংলা সাহিত্যে মাইকেল আজও আধুনিকতার এক অমোঘ প্রতীক।

 

(আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।