পাঁচ মাসে ১০ শতাংশও খরচের পর্যায়ে যায়নি কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্থ! স্বচ্ছ ভারত প্রকল্পে বাংলার জন্য কেন্দ্র বরাদ্দ করেছে প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা। অগস্ট শেষেও তার মধ্যে খরচের প্রক্রিয়ায় গিয়েছে মাত্র ৫২ কোটি। অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ বরাদ্দ এখনও সেই পর্যায়েই পৌঁছয়নি। কেন্দ্রে বিজেপি, রাজ্যেও বিজেপি। একই দলের সরকার হলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা দ্রুত কাজে লাগবে, উন্নয়নের গতি বাড়বে—‘ডবল ইঞ্জিন’ মডেলের অন্যতম দাবি সেটাই। তাহলে বাংলায় নতুন সরকার আসার প্রথম কয়েক মাসেই এই হাল কেন?
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে স্বচ্ছ ভারত মিশন-গ্রামীণের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ ৫৯৫ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। ৩১ অগস্ট পর্যন্ত ফান্ড ট্রান্সফার অর্ডার বা এফটিও হয়েছে মাত্র ৫২ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার। প্রায় ৮.৮ শতাংশ। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে ৯ মে। অর্থাৎ অর্থবর্ষের প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যে প্রায় চার মাসই নতুন সরকারের হাতে ছিল। নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক বদল এবং বর্ষায় কাজের গতি কমে থাকতে পারে। কিন্তু সরকারি হিসাব বলছে, অগস্ট শেষেও এফটিও ৯ শতাংশ ছোঁয়নি।
পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিক অবশ্য বিগত সরকারকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আগের আমলে শৌচালয়ের টাকা নিয়ে দুর্নীতির কারণে মানুষের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে অনীহা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু কোথায় দুর্নীতি হয়েছে? কত টাকা নয়ছয় হয়েছে? কার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে? নতুন সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আর আগের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ চলতি অর্থবর্ষের ৫৯৫ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৫২ কোটি টাকার এফটিও হওয়ার ব্যাখ্যা দেয় কী ভাবে?
কেন্দ্র টাকা দেয়নি, সেই যুক্তিও এখানে খাটছে না। পশ্চিমবঙ্গ এখন এসএনএ-স্পর্শ ব্যবস্থায় যুক্ত। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ছাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্র বরাদ্দও করেছে। কাজের জন্য অর্থের চাহিদা তৈরি করে তা ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব রাজ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।
জেলা ধরে বরাদ্দও বিপুল। দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রায় ৬৬ কোটি, পশ্চিম মেদিনীপুর ৫৫ কোটি, হুগলি ৫৪ কোটি, মালদহ ৪৫ কোটি এবং কোচবিহার প্রায় ৪১ কোটি টাকা পেয়েছে।
কোন জেলা কতটা অর্থ কাজে লাগিয়েছে, কোথায় কাজ আটকে রয়েছে, তার জেলা-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। এখন জেলা আধিকারিকদের নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠকের পরিকল্পনা করেছে সরকার। পাঁচ মাস পরে ৯ শতাংশেরও কম এফটিও হওয়ার পরেই প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে হল কেন?
আর এই অর্থ শুধু শৌচালয় তৈরির জন্য নয়। স্বচ্ছ ভারত মিশন-গ্রামীণের আওতায় কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিকাশি, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, কমিউনিটি স্যানিটেশন এবং ওডিএফ প্লাস গ্রাম তৈরির কাজও রয়েছে। অর্থ কাজে না লাগলে গ্রামের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামোর কাজও পিছিয়ে যেতে পারে।
বিরোধী থাকার সময় কেন্দ্রীয় প্রকল্প আটকে যাওয়ার দায় রাজ্য সরকারের উপর চাপিয়েছে বিজেপি। এখন কেন্দ্রেও বিজেপি, বাংলাতেও বিজেপি। কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক সংঘাতের সেই যুক্তিও আর নেই। বরং ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর প্রতিশ্রুতিই ছিল, একই দলের দুই সরকার থাকলে টাকা ও প্রকল্পের সমন্বয় আরও দ্রুত হবে।
কেন্দ্র ৫৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। টাকা ছাড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তার পরেও পাঁচ মাসে ১০ শতাংশও এফটিও পর্যায়ে পৌঁছল না কেন? প্রায় ৯১ শতাংশ বরাদ্দ এখনও সেই পর্যায়ে না পৌঁছনোর দায় কার? আগের সরকারের দিকে আঙুল তুলেই কি নতুন সরকারের দায়িত্ব শেষ? যে ‘ডবল ইঞ্জিন’-এ উন্নয়নের গতি বাড়ার কথা ছিল, বাংলায় সেই ইঞ্জিন এত মন্থর কেন? এমন নানা প্রশ্নই উঠছে।
তথ্যসূত্র: কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের স্বচ্ছ ভারত মিশন-গ্রামীণ আর্থিক তথ্য, ৩১ অগস্ট ২০২৬; পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর; পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিকের বক্তব্য; কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের এসএনএ-স্পর্শ সংক্রান্ত নির্দেশিকা।