কানাই দাস
এক বছর আগে, ঠিক এই সময়টায় অসম, উত্তর-পূর্ব ভারতসহ দেশের বেশ কিছু রাজ্য যেন হঠাৎ থমকে গিয়েছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫—তারিখটি আজও অসমবাসীর স্মৃতিতে গভীর বেদনার অক্ষরে লেখা। সেদিনই প্রয়াত হয়েছিলেন অসমের প্রিয় সন্তান, শিল্পী জুবিন গার্গ। দেখতে দেখতে সেই বেদনাদায়ক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অথচ মনে হয়, ঘটনাটি যেন এই সেদিনের।
একজন শিল্পীর চলে যাওয়া কীভাবে একটি গোটা জনপদকে একসঙ্গে কাঁদাতে পারে, কীভাবে একজন মানুষ মৃত্যুর পরও মানুষের ঘরে ঘরে, মনে মনে বেঁচে থাকতে পারেন—জুবিন গার্গের জীবনের শেষ দেড় দিন, দেড় রাত্রি তারই এক বিরল উদাহরণ। সেই দেড় দিন ও দেড় রাত্রির স্মৃতি আজও যেন অসমের বাতাসে, মানুষের কথায়, গানে আর অশ্রুসিক্ত চোখে ফিরে ফিরে আসে।
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে অসম এমন এক দৃশ্য দেখেছিল, যার সাক্ষী থাকা সহজ ছিল না। জাতি, ধর্ম, বর্ণের বিভেদ ভুলে অসংখ্য মানুষ তখন একজন প্রিয় শিল্পীর শেষ সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। কেউ প্রার্থনা করছিলেন, কেউ প্রদীপ জ্বালাচ্ছিলেন, কেউ নীরবে তাঁর গান শুনছিলেন। আর কোথাও কোথাও মানুষ রাত জেগে শুধু একটি খবরের অপেক্ষা করছিলেন।
জুবিন গার্গ—জন্ম ১৮ নভেম্বর ১৯৭২, তুরা, মেঘালয়। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সিঙ্গাপুরে তাঁর জীবনাবসান। মৃত্যুর খবরটি যখন প্রথম ছড়িয়ে পড়ল, তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। সামাজিক মাধ্যমে খবরটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল যে অনেকের মতো আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো এটি গুজব। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন সত্যিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন যেন অসমের আকাশ-বাতাস বদলে গেল।
স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে সমুদ্রের জলে ডুবে জুবিনের মৃত্যু—এই খবর মানুষকে ঘরের বাইরে নিয়ে এল। পথ, ঘাট, মাঠ, বাজার, অলি-গলি, স্কুল-কলেজ, নামঘর, মন্দির, মসজিদ গির্জা ,সবখানেই তখন শুধু জুবিনের কথা। তাঁর গান, তাঁর জীবন, তাঁর নানা স্মৃতি মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগল।
অসমের তৈলশহর ডিগবৈয়ে বসে আমিও সেই সময়ের কিছু দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি। মনে হয়েছিল, একজন শিল্পীর বিদায় যেন ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত শোককে একটি বৃহৎ সামাজিক শোকে পরিণত করছে।
সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হল তাঁর শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি। তিনি শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, ছিলেন গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা—বহুমাত্রিক এক শিল্পী। তাই তাঁর বিদায়ও ছিল অন্যরকম। তাঁর গানই হয়ে উঠেছিল তাঁকে স্মরণ করার প্রধান ভাষা।
গ্রামের অলি-গলি থেকে শহরের রাস্তা, বাজার-ঘাট থেকে দোকানপাট, স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-কাছারি থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সর্বত্র বেজে উঠেছিল জুবিনের কণ্ঠ। বিশেষ করে ‘মায়াবিনী রাতির বুকুত’ গানটি যেন সেই শোকের সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছিল। তাঁর অনুরাগীরা তাঁর শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে গানটি গেয়েছেন। কাউকে আলাদা করে অনুরোধ করতে হয়নি। কোনো সরকারি নির্দেশেরও প্রয়োজন হয়নি। ভালোবাসাই মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল।
বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হলেও জুবিন ফিরে এলেন নিজের মানুষের কাছে। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া, পরে শেষ বিদায়ের সময় শিল্পীর সামনে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানানো—সব মিলিয়ে সেই সময়ের দৃশ্যগুলো ছিল গভীরভাবে আবেগময়।
পুরো অসম তখন যেন একজন প্রহরীর মতো জেগে ছিল। শেষ দর্শনের জন্য মানুষের ঢল নেমেছিল। প্রায় বারো লক্ষেরও বেশি মানুষের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। একজন শিল্পীর শেষযাত্রায় এত মানুষের সমাগম নিঃসন্দেহে বিরল। জুবিন জীবিত অবস্থায় নিজেকে যতই সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখুন না কেন, তাঁর মৃত্যুর পর মানুষের ভালোবাসাই তাঁর প্রকৃত পরিচয় হয়ে উঠেছিল।
তবে সেই শোকের মধ্যেও কিছু দৃশ্য ছিল অন্যরকম। জুবিনের স্মরণসভা ও শেষযাত্রার বিভিন্ন সময়ে পশুপাখির উপস্থিতি আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল। কোথাও তাঁর ছবির সামনে কুকুর বসে আছে, কোথাও বানর তাঁর ছবি হাতে নিয়ে আছে, কোথাও গরু কিংবা অন্য প্রাণীর উপস্থিতি চোখে পড়েছে। জুবিন জীবিত অবস্থায় পশুপাখি ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাই এই দৃশ্যগুলোকে আমার কাছে নিছক কাকতালীয় বলে মনে হয়নি।
সেই সময় অসমের আপার অসম, লোয়ার অসম এবং বরাক উপত্যকার মানুষ যেন একই আবেগে একত্রিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়েও মানুষের ঐক্যের একটি ছবি ফুটে উঠেছিল। রাজনীতি, দল বা সংগঠনের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সেখানে মানুষের পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছিল।
শেষযাত্রার পথে জনসমুদ্রের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ হেঁটেছেন। চোখে জল, বুকে ব্যথা, মুখে একটাই ধ্বনি—‘জয় জুবিন দা’। ফুলের তোড়া, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দেওয়া অসংখ্য গামছা এবং মানুষের ভালোবাসায় শেষ ঠিকানায় পৌঁছেছিলেন প্রিয় শিল্পী।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, টলিউডের শিল্পী ও কলাকুশলী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের বাইরেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। নিউইয়র্ক, বাংলাদেশ, লন্ডন, প্যারিসসহ বিভিন্ন জায়গায় থাকা তাঁর বন্ধু ও অনুরাগীরাও শোক প্রকাশ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বহু বিশিষ্ট মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন।
জুবিনের মৃত্যুর পর তাঁর গানগুলোও যেন নতুন করে মানুষের কাছে ফিরে এল। ‘মায়াবিনী রাতির বুকুত’-এর পাশাপাশি ‘মোর মৃত্যুৰ দিনা’, ‘তুমি আহিবা’, ‘মাঝিৰে’, ‘মন মোর ৰসনা’, ‘একা মনে প্রশ্ন শুধুই’—’পিয়া রে পিয়া রে’ ,এমন বহু গান ঘরে ঘরে বাজতে লাগল। তাঁর গান শুনতে শুনতে মানুষ যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকেই খুঁজছিল।
জুবিন নিজেকে কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। তাঁর নিজের কথায়, তাঁর কোনো জাতি নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো ভগবান নেই—তিনি মুক্ত। আবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অর্ধেক বাঙালি, অর্ধেক অসমীয়া।’ তাঁর এই মুক্ত পরিচয়ই হয়তো তাঁকে এত মানুষের কাছে আপন করে তুলেছিল।
সোনাপুরে তাঁর শেষকৃত্যের দৃশ্যও ছিল হৃদয়বিদারক। কেউ গাছে উঠে শেষবারের মতো তাঁকে দেখেছেন, কেউ আবেগে চিৎকার করে কেঁদেছেন। প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের জীবনও বিপন্ন করেছেন। এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা হয়তো যুক্তি দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
প্রকৃতির প্রতিও জুবিনের ছিল গভীর টান। তিনি গাছ লাগিয়েছেন, পশুপাখিকে ভালোবেসেছেন। তাঁর শেষকৃত্যে তাঁর নিজের হাতে রোপণ করা চন্দনগাছের কাঠের উপস্থিতি তাই আমার কাছে একটি গভীর প্রতীকের মতো মনে হয়েছে। যে মানুষ প্রকৃতিকে ভালোবেসেছিলেন, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিরই কোলে ফিরে গেলেন।
আজ এক বছর পরে দাঁড়িয়ে জুবিনকে মনে করলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—তাঁর প্রতি আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধা কী?
শুধু তাঁর গান গাওয়া বা তাঁর জন্মদিন-মৃত্যুদিন স্মরণ করাই কি যথেষ্ট? আমার মনে হয়, যথেষ্ট নয়। তাঁর শিল্পের পাশাপাশি তাঁর মানবিকতা, মুক্তচিন্তা, প্রকৃতিপ্রেম এবং মানুষ ও জীবজগতের প্রতি ভালোবাসাকেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
জুবিন গার্গ ছিলেন এক বহুমাত্রিক শিল্পী। বহু ভাষায় গান, চলচ্চিত্র, অভিনয়, সুরসৃষ্টি—সব মিলিয়ে তাঁর শিল্পীজীবন ছিল বিশাল। তাই তাঁর মৃত্যু শুধু একজন গায়কের মৃত্যু নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার আকস্মিক অবসান।
এক বছর পরেও সেই দেড় দিন, দেড় রাত্রির কথা মনে পড়ে। মনে হয়, সেদিন অসম শুধু একজন শিল্পীকে বিদায় দেয়নি , নিজের ঘরের একজন মানুষকে বিদায় দিয়েছিল।
তাই আজও প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে, আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করে—জয় জুবিন দা।জয় জুবিন দা। জয় জুবিন দা।
তাঁর গান বেঁচে থাকুক। তাঁর মানবিকতা বেঁচে থাকুক। আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকুক তাঁর মানবিকতার ‘জুবিনমিথ’-এর সেই অনন্য কাহিনি।