‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে শরীরের ক্ষতি করে! ফ্যাটি লিভার সারাতে মেনে চলা যেতে পারে ২১ দিনের নিয়ম

যাপনের জেরে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ছে। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে ক্রমশ। অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অতিরিক্ত মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, কায়িক শ্রমের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত....

যাপনের জেরে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ছে। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে ক্রমশ। অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অতিরিক্ত মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, কায়িক শ্রমের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন— সব কিছুর দিকেই উঠছে আঙুল। তবে শুরুর দিকে ধরা পড়লে জীবনযাত্রায় নিয়মিত পরিবর্তন এনে অনেক ক্ষেত্রেই লিভার আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে যোগ এবং ফিটনেস প্রশিক্ষক হংসজি যোগেন্দ্র যাপনে কয়েকটি বদল এনে ২১ দিনে লিভার সুস্থ করার একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন, যেখানে খাদ্যাভ্যাস থেকে শারীরচর্চা, সবেরই উল্লেখ রয়েছে। এই ২১ দিনের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, কোনও কঠোর বা দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট নয়, বরং খাবার ও জীবনযাপনের এমন কিছু অভ্যাস তৈরি করা, যা দীর্ঘদিন বজায় রাখা যায়।

২১ দিনে ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরিকল্পনা

১. তরল চিনি বাদ:এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল মিষ্টি পানীয় বন্ধ করা। অনেকেই মিষ্টি খান না, কিন্তু নানাবিধ পানীয়ের মাধ্যমে শরীরে চিনি প্রবেশ করে। তাই সফ্‌ট ড্রিঙ্ক, প্যাকেটজাত ফলের রস বা চিনি মেশানো অন্য কোনও পানীয় নিয়মিত খেলে খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিনি শরীরে ঢুকে যেতে পারে। তার বদলে গোটা ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমলকি, পেয়ারা, কমলালেবু এবং পেঁপের মতো ফলে ফাইবারও থাকে আবার প্রাকৃতিক ভাবে মিষ্টির স্বাদও পাওয়া যাবে। এতে চট করে রক্তে শর্করা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা কমবে।

২. থালা সাজানোর নিয়ম:ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে শুধু কী খাবেন, তা নয়— একসঙ্গে কতটা এবং কোন অনুপাতে খাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী, থালার অর্ধেক জুড়ে রাখা যেতে পারে বিভিন্ন সব্জি। এক-চতুর্থাংশে থাকবে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং বাকি এক-চতুর্থাংশে থাকবে দানাশস্য বা পুষ্টিকর কার্বোহাইড্রেট। এর ফলে ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়তে পারে, যা ফ্যাটি লিভারের রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

৩. স্বাস্থ্যকর ফ্যাটে ভরসা:ফ্যাটি লিভার হয়েছে বলে সব ধরনের ফ্যাট খাবার থেকে বাদ দিতে হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বাদ দিতে হবে মূলত অতিরিক্ত ভাজাভুজি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটে ভরপুর খাবার। অন্য দিকে বাদাম ও বীজের মতো খাবার থেকে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট পাওয়া যায়। আমন্ড, আখরোট, তিসি এবং কুমড়োর বীজ খাবারের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে রাখা যেতে পারে।

৪. শরীরকে সক্রিয় রাখা: ফ্যাটি লিভার কমানোর চেষ্টা করতে হলে সারাদিন বসে থেকে শুধু মেপে খেলেই চলবে না। প্রতিদিন শরীরকে সক্রিয় রাখাও জরুরি। নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি পেশির শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং যোগাসন করা যেতে পারে। প্রশিক্ষক বলছেন, উৎকটাসন, সেতুবন্ধাসন এবং প্ল্যাঙ্কের মতো ব্যায়াম তালিকায় রাখা যেতে পারে। শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকলে লিভারে ফ্যাট জমার পরিমাণ কমতে পারে।

৫. প্রাণায়াম করা: ফ্যাটি লিভার কমানোর জন্য মানসিক চাপ কমানোও জরুরি। আর তাই নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম করে মনকে শান্ত রাখা দরকার। অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজ়মকে সরাসরি প্রভাবিত করে এবং লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাই প্রশিক্ষকের পরামর্শ, যোগেন্দ্র তালাসন, যোগেন্দ্র কোণাসন, যোগেন্দ্র বক্রাসন এবং পবনমুক্তাসন করার। এর সঙ্গে ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক ব্রিদিং, অনুলোম-বিলোম এবং ভ্রামরী প্রাণায়াম করা যেতে পারে। এগুলির উদ্দেশ্য সরাসরি লিভারের চর্বি গলানো নয়, বরং শরীরকে সক্রিয় রাখা, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা।

৬. নৈশভোজের সময় এগোনো: ফ্যাটি লিভারের যত্নে রাতের খাবারের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। খাওয়ার পর আবার গভীর রাতে ভাজাভুজি বা মিষ্টি দিয়ে মুখ চালানোর অভ্যাসও কমাতে হবে। নয়তো বিপাকক্রিয়ার উপর অত্যধিক চাপ পড়ে যেতে পারে।

৭. ঘুমকে বিশেষ গুরুত্ব: শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্য ঠিক রাখার নেপথ্যে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং ঘুমের সময় ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। ঘুমের সময়ে কোষ মেরামতির কাজও চলতে থাকে শরীরে। ফলে সেই সময়টুকু শরীরকে দিতে হবে।

 

৮. মদ্যপান ত্যাগ: লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে অ্যালকোহল। তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে মদ্যপান এড়িয়ে চলতেই হয়। লিভারের সমস্যার ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শও প্রয়োজন এ ক্ষেত্রে।

তবে ২১ দিনের এই পরিকল্পনাকে ফ্যাটি লিভারের ‘ওষুধ’ হিসেবে দেখলে মুশকিল। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন শুরু করার জন্য ২১ দিন একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা বটে, কিন্তু লিভারে জমা চর্বি কমানো এবং লিভারের স্বাস্থ্য উন্নত করা সাধারণত নিয়মিত ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের বিষয়।