মাহদী হাসান
আমরা জন্মগতভাবে বিশ্বাস করতে শিখেছি, যেহেতু মক্কা-মদিনা সৌদি আরবের ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থিত, সেহেতু রিয়াদের সিংহাসনে বসা শাসকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ‘পবিত্র মক্কার খাদেম’! তারা যা-ই করুক না কেন, তাদের সমালোচনা করা যাবে না।
কিন্তু শাসন ক্ষমতায় বসলেই কি কেউ ‘খাদেম’ হয়ে যায়?
ইতিহাসের আতশিকাঁচ দিয়ে দেখলে একটি অত্যন্ত রূঢ় এবং নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে।
মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) কাবা শরিফ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পর থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত মাঝখানের ওই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ে কাবার শাসক কারা ছিল? তারা তো কাবার ভেতরেই মূর্তি স্থাপন করেছিল, কাবার পবিত্রতাকে ব্যবহার করে নোংরা ব্যবসা করেছিল। তারাও তো নিজেদের সে যুগে কাবার ‘খাদেম’ বা রক্ষক দাবি করত!
তাহলে আজ, বিন সালমানের যুগে যখন মক্কা-মদিনার অদূরে নাইট ক্লাব বসে, যখন মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তা নেয়, যখন কাবা শরীফের গিলাফ বিকৃত যৌনাচারের এপস্টিনের কাছে পাঠানো হয়, তখন কি মুসলিম বিশ্ব নতুন কোনো ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেনি?
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার রিপোর্ট, এপস্টিন ফাইলসের ডকুমেন্টস ও ছবি প্রমাণ করেছে যে, এই এপস্টিনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সৌদি আরবের বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের। এবং সেই বিন সালমানের মাধ্যমেই কাবার অত্যন্ত পবিত্র ওই গিলাফের অংশবিশেষ উপহার হিসেবে পৌঁছেছিল বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত ওই সেক্স অফেন্ডারের হাতে!
একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। যে কাবার দিকে ফিরে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিশ্বের ২০০ কোটি মুসলমান দিনে পাঁচবার সেজদা দেয়, যে পবিত্র গিলাফ ছুঁয়ে মানুষ চোখের জল ফেলে, সেই কাবার পবিত্র কাপড় একজন মুসলিম শাসক উপহার হিসেবে তুলে দিচ্ছেন এমন এক দানবের হাতে, যে কি না শিশুদের নিয়ে বিকৃত যৌন ব্যবসা করত!
এটি কি কেবল একটি সাধারণ উপহার ছিল, নাকি এটি ছিল ইসলামের পবিত্রতম প্রতীকটিকে শয়তানের পায়ে লুটিয়ে দেওয়ার এক নিখুঁত ও পৈশাচিক বেইমানি? এই চরম সত্যটি জানার পরও কি বিন সালমানকে ‘পবিত্র মাটির খাদেম’ বলাটা আমাদের ঈমানের সাথে সবচেয়ে বড় উপহাস নয়?
উত্তর আমরা সবাই জানি।
হাদিস শরিফে আমাদের প্রফেট মহানবী (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে গেছেন যে, কেয়ামতের আগে যখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে, তখন সে পুরো পৃথিবী চষে বেড়াবে। কিন্তু সে দুটি জায়গায় প্রবেশ করতে পারবে না…মক্কা এবং মদিনা।
এই ভবিষ্যদ্বাণীটি নিয়ে আমরা যদি বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে কী দেখতে পাই? দাজ্জাল মক্কা বা মদিনায় ঢুকতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু সৌদি আরবের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর রাজধানী বা ক্ষমতার মূল কেন্দ্র কোথায়? মক্কা বা মদিনায় নয়; তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হল…রিয়াদ।
আর সেই রিয়াদ থেকেই আজ পুরো সৌদি আরবে এমন একটি ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যা আক্ষরিক অর্থেই দাজ্জালীয় বা শয়তানি ব্যবস্থারই নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট। দাজ্জাল ফিজিক্যালি মক্কায় ঢুকতে পারবে না, কিন্তু তার বস্তুবাদী আদর্শ এবং তার ধোঁকাবাজির সিস্টেম কি ইতিমধ্যেই রিয়াদ থেকে শুরু করে মক্কা-মদীনার সীমানার বাইরে পুরো আরব উপদ্বীপকে গ্রাস করে ফেলেনি?
সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটি হলো আমাদের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব। আমরা জন্মগতভাবেই ধর্মভীরু একটি জাতি। কিন্তু আমাদের এই ধর্মভীরুতাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ‘অন্ধভক্তি’-তে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
বেশিরভাগ মানুষ এই যে বিন সালমান পরিবারকে মক্কার খাদেম মনে করে, এটি আসলে সেই ভবিষ্যদ্বাণীরই ইঙ্গিত দেয়…কেয়ামতের আগে দাজ্জাল কিরকম ইলিউশন তৈরি করে! বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর মতো একজন মানুষ যদি পরিচয় গোপন করে, লেবাস বদলে ফেলে সৌদি আরবের শাসন ক্ষমতায় থাকতো…তাহলে তাকেও প্রচুর মুসলমান মক্কার খাদেম বা রক্ষক মনে করতে পারে!
অনেক কিছুই আজ ভয়ংকরভাবে মিলে যাচ্ছে।
আমরা এটা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি যে, কাবা শরীফের পবিত্রতা এক জিনিস, আর ওই ভূখণ্ডটি যারা শাসন করছে তাদের রাজনৈতিক চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একজন শাসক সিংহাসনে বসলেই সে খাদেম হয়ে যায় না। খাদেম হতে হলে হযরত ওমর (রা.) বা খোলাফায়ে রাশেদীনের মতো ইনসাফ, ত্যাগ এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি দরদ থাকতে হয়।
বিন সালমানের মধ্যে এর কোনটি আছে? আমাদের আজ পড়াশোনা করা উচিত। আমাদের বিশ্লেষণ করা উচিত যে, রিয়াদের সিংহাসনে বসে থাকা ওই মানুষগুলোর ভেতরে কি সত্যিই কোনো খাদেমের গুণাবলি আছে, নাকি তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে দাজ্জালের বস্তুবাদী এবং ধোঁকাবাজির বৈশিষ্ট্য?
দাজ্জালকে চেনার জন্য আমাদের কোনো ফ্যান্টাসির দরকার নেই। দাজ্জালের সিস্টেম তো এটাই…সে ফিজিক্যালি মক্কায় ঢুকবে না, কিন্তু সে মক্কার খাদেমদের আত্মাকে এমনভাবে কিনে নেবে যে, তারা নিজেরাই কাবার পবিত্রতাকে শয়তানের পায়ে লুটিয়ে দেবে।
যারা এখনো ‘রিজিকের ভয়’ বা ‘খারেজি’ ফতোয়ার ভয়ে ওই শাসকদের অন্ধভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন, তাদের আজ আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। যখন রক্ষকরাই কাবার গিলাফ শয়তানের হাতে তুলে দিচ্ছে, তখন সেই রক্ষকদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে আপনি নিজের অজান্তেই শয়তানের খাতায় নিজের নামটা লিখে ফেলছেন না তো?
আজান হচ্ছে…
মক্কার দিকে ফিরে আপনি হয়তো সেজদাহ দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি সেজদাহ দিচ্ছেন কাবামুখী হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে, রিয়াদের সিংহাসন বা কোনো নির্দিষ্ট শাসককে নয়। ভক্তির ওই অন্ধ পর্দা যদি আজই আপনি টেনে না ছিঁড়তে পারেন, তবে হয়তো কেয়ামতের দিন দেখতে পাবেন…আপনার ঈমানটাও ওই এপস্টিনের দ্বীপের মতোই কোনো এক নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে!