আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষক পুরস্কার পেলেন কারাবন্দী উমর খালিদ

২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা চক্রান্ত মামলায় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি উমর খালিদ ২০২৬ সালের ‘অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস অ্যাট রিস্ক’ আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হলেন। বৃহস্পতিবার তাঁর হাতে....

২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা চক্রান্ত মামলায় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি উমর খালিদ ২০২৬ সালের ‘অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস অ্যাট রিস্ক’ আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হলেন। বৃহস্পতিবার তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।​আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস’-এর পক্ষ থেকে এই সম্মান প্রদান করা হয়ে থাকে। ডাবলিনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। যদিও কারাবন্দি থাকায় খালিদ নিজে সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ​২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। সেই থেকে তিনি জেলে বন্দি রয়েছেন।

​এ বছর খালিদের পাশাপাশি এই পুরস্কার পেয়েছেন ইরানের মৃত্যুদণ্ডবিরোধী প্রচারক আহমাদরেজা হায়েরি, অ্যাঙ্গোলার নারী অধিকার ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সমর্থক লরিন্ডা ম্যানুয়েল গোভেইয়া, ব্রাজিলের কৃষ্ণাঙ্গ রূপান্তরকামী নারী নেত্রী আডা ভিক্টোরিয়া কায়েতানো এবং সার্বিয়ার নারী অধিকার ও শান্তি কর্মী ল্যিলিয়ানা নেশিচ।

​২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার সাথেই উমর খালিদকে যুক্ত করে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ওই ভয়াবহ হিংসায় ৫৩ জনের মৃত্যু হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। নিহতদের বড় অংশই ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের। ​উমর খালিদ, শারজিল ইমাম এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ), সরকারি সম্পত্তি বিনাশ রোধ আইন, অস্ত্র আইন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ​পুলিশের দাবি, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনাতেই এই হিংসা ছড়িয়েছিল এবং নরেন্দ্র মোদী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের অংশ ছিল।

​‘ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস’-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “উমর খালিদের এই দীর্ঘ কারাবাস মূলত ভারতের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। যেখানে ভিন্নমত দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, জনমত গঠনে আজ্ঞাবহ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই কিংবা কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই জামিনের কঠোর নিয়মাবলীকে সাজা হিসেবে ব্যবহার করার এক বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”​ সংগঠনটি বলেছে , “এই প্রবণতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই সমস্ত মানবাধিকার রক্ষা কর্মী, সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা- যাঁরা তাঁদের শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও স্বাধীন মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করছেন।” ​সংস্থাটির মতে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অমরাবতীতে খালিদের দেওয়া যে ভাষণটিকে প্রসিকিউশন বা সরকারি পক্ষ পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্তের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে, তা কোনোভাবেই হিংসায় উস্কানি দেওয়ার সামিল নয়। ​

উক্ত ভাষণে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রশংসা করতে গিয়ে খালিদ ‘ইনকিলাবি সালাম’ (বিপ্লবী সালাম) এবং ‘ক্রান্তিকারী ইস্তিকবাল’ (বিপ্লবী অভ্যর্থনা)এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। ​পাশাপাশি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময়েই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে পাথেয় করে অহিংস আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছিলেন খালিদ।

​গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লি হাইকোর্ট উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন তৃতীয়বারের মতো খারিজ করে দেয়।​হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, তারা বিচার বিভাগীয় অনুশাসনের দ্বারা বাধ্য এবং এই দুই অভিযুক্তের বিষয়ে গত ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট যেসব শর্ত আরোপ করেছিল, তা পরিবর্তন বা সংশোধন করার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। ​উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট খালিদ ও ইমামের জামিন আবেদন নাকচ করলেও গুলফিশা ফাতিমা, মীরা হায়দার, শিফা-উর-রহমান, মুহাম্মদ সালিম খান এবং শাদাব আহমেদের মতো সমাজকর্মীদের আইনি স্বস্তি ও জামিন মঞ্জুর করেছিল। ​শীর্ষ আদালত তখন জানিয়েছিল, সুরক্ষিত সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ সম্পন্ন হলে কিংবা এক বছর অতিক্রান্ত হলে- যার মধ্যে যেটি আগে ঘটবে খালিদ ও ইমাম নতুন করে পুনরায় জামিনের আবেদন করতে পারবেন।