উদার আকাশের পঁচিশ বছর : ফারুক আহমেদের স্বপ্নের দীপ্ত ইতিহাস

রোকেয়া ইসলাম কোনো কোনো মানুষ কেবল নিজের জন্য বাঁচেন না। তাঁরা একটি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন, আর সেই স্বপ্ন একসময় বহু মানুষের আশ্রয়ে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য পত্রিকা ‘উদার আকাশ’ তেমনই....

রোকেয়া ইসলাম

কোনো কোনো মানুষ কেবল নিজের জন্য বাঁচেন না। তাঁরা একটি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন, আর সেই স্বপ্ন একসময় বহু মানুষের আশ্রয়ে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য পত্রিকা ‘উদার আকাশ’ তেমনই এক স্বপ্নের নাম। পঁচিশ বছর আগে যে কিশোর স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে একটি ছোট পত্রিকা বের করার সাহস দেখিয়েছিল, আজ সেই পত্রিকাই দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে আছে উদার আকাশের শিল্পিত সৃজন জমিন।
সেই কিশোর আজকের সম্পাদক ফারুক আহমেদ।
এই গল্প কোনো অলৌকিক সাফল্যের নয়; এটি নিষ্ঠা, ধৈর্য, ত্যাগ এবং সাংস্কৃতিক দায়বোধের গল্প। সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করে কেউ ধনী হয় না, খ্যাতির নিশ্চয়তাও পায় না। বরং প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থসংকট, অনিশ্চয়তা, শ্রম এবং নানান প্রতিকূলতা। তবু কেউ কেউ থেমে যান না। কারণ তাঁদের কাছে সাহিত্য কেবল নেশা নয়, সমাজ গঠনের এক নীরব অঙ্গীকার। ফারুক আহমেদ সেই অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছোট কাগজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নতুন কবি, নতুন গল্পকার, নতুন চিন্তা, নতুন সাহিত্য-আন্দোলনের জন্ম হয়েছে এসব পত্রিকার হাত ধরেই। মূলধারার বাইরে থেকেও ছোট কাগজ সময় ও সমাজকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, নতুন রুচি তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতের সাহিত্যকে প্রস্তুত করেছে। ‘উদার আকাশ’ সেই ধারারই একটি উজ্জ্বল উত্তরাধিকার।
পত্রিকাটির জন্ম মুসলিম সমাজে শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও মননশীলতার বিকাশের আকাঙ্ক্ষা থেকে। কিন্তু এই লক্ষ্য কখনোই তাকে সংকীর্ণতার দিকে ঠেলে দেয়নি। বরং সে বুঝেছে, প্রকৃত উন্নতি তখনই সম্ভব যখন মানুষ মানবিক হবে, মুক্তচিন্তার চর্চা করবে এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকেও সমান সম্মানের চোখে দেখবে। তাই ‘উদার আকাশ’ একদিকে যেমন মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আপন করে নিয়েছে। এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভাজনের রাজনীতি মানুষকে ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দিতে চাইছে, তখন ‘উদার আকাশ’-এর মতো একটি সাহিত্যপত্র আমাদের নতুন করে আশা জাগায়। এটি শেখায়—সাহিত্যের কোনো ধর্ম নেই, ভাষার কোনো সীমান্ত নেই, সৃজনশীলতার কোনো প্রাচীর নেই।
পঁচিশ বছরের এই যাত্রায় ‘উদার আকাশ’ কেবল নিয়মিত প্রকাশিত হয়নি; প্রকাশ করেছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ সংখ্যা। এসব সংখ্যা কেবল একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখার সংকলন নয়, বরং সময়কে ধারণ করার প্রয়াস। একজন সম্পাদক যখন একটি বিশেষ সংখ্যা পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি ভবিষ্যতের পাঠকের জন্যও একটি দলিল তৈরি করেন। ফারুক আহমেদ সেই কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেছেন।

 

দুই বাংলার সাহিত্যিকদের একত্রে নিয়ে আসার যে কাজ ‘উদার আকাশ’ করেছে, সেটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক সীমান্ত ভাষাকে আলাদা করতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সাহিত্য একই শিকড়ে জন্ম নেওয়া দুটি শাখা। এই দুই ধারার লেখকদের একই মলাটে স্থান দিয়ে ‘উদার আকাশ’ প্রমাণ করেছে যে বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক ঐক্য আজও অটুট। এই উদ্যোগ দুই দেশের লেখকদের পারস্পরিক পরিচয়, সংলাপ এবং সাহিত্যিক বিনিময়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

 

একজন সম্পাদক আসলে কেবল লেখা ছাপান না; তিনি সময়ের বিবেকও নির্মাণ করেন। কোন লেখাটি পাঠকের কাছে পৌঁছাবে, কোন নতুন লেখককে সুযোগ দেওয়া হবে, কোন চিন্তাকে সামনে আনা হবে—এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই একজন সম্পাদকের সাহিত্যবোধ প্রকাশ পায়। ফারুক আহমেদের সম্পাদনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশে নবীনদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া। এই উদারতাই ‘উদার আকাশ’-কে সত্যিকার অর্থে একটি সাহিত্য পরিবারে পরিণত করেছে।
ডিজিটাল যুগে ছাপা সাহিত্যপত্র টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুততার মধ্যে গভীর পাঠের অভ্যাস কমছে। কাগজের দাম বাড়ছে, মুদ্রণ ব্যয় বাড়ছে, বিজ্ঞাপনের সুযোগ কমছে। এই বাস্তবতায় একটি সাহিত্যপত্রকে টানা পঁচিশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখা নিঃসন্দেহে এক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। ফারুক আহমেদের এই সংগ্রাম আমাদের শ্রদ্ধার দাবিদার।

 

‘উদার আকাশ’ নামটির মধ্যেই যেন তার দর্শন লুকিয়ে আছে। আকাশ যেমন সবার জন্য উন্মুক্ত, তেমনি সাহিত্যও সবার। এখানে সংকীর্ণতার স্থান নেই; আছে মুক্তচিন্তার আহ্বান, মানবিকতার দীপ্তি এবং সৌন্দর্যের অনুসন্ধান। এই দর্শনই পত্রিকাটিকে সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।
আজ যখন আমরা ‘উদার আকাশ’-এর পঁচিশ বছর উদ্‌যাপন করি, তখন আমরা কেবল একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করি না; আমরা উদ্‌যাপন করি এক মানুষের অবিচল বিশ্বাসকে। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে শুরু হওয়া যে পথচলা আজ হাজারো পাঠক, লেখক এবং শুভানুধ্যায়ীর ভালোবাসায় সমৃদ্ধ, তা আমাদের শেখায়—বড় স্বপ্ন দেখতে হলে বড় পুঁজি নয়, দরকার বড় হৃদয়।

 

ফারুক আহমেদ সেই হৃদয়ের মানুষ। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যকে ভালোবাসা মানে কেবল লেখা নয়; সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নীরবে কাজ করাও এক ধরনের সৃজন। তাঁর শ্রম, ধৈর্য ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পাদকদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পঁচিশ বছর কোনো যাত্রার শেষ নয়; বরং নতুন অভিযাত্রার সূচনা। আগামী দিনেও ‘উদার আকাশ’ তার উদারতা, মানবিকতা ও সাহিত্যনিষ্ঠা নিয়ে আরও দূর এগিয়ে যাক—এই প্রত্যাশাই রইল। কারণ বাংলা ভাষার আকাশ যত উদার হবে, আমাদের সাহিত্যও তত সমৃদ্ধ হবে।
সম্পাদক ফারুক আহমেদের সাথে এখনও আমার দেখা হয়নি , ফোনে হাতেগোনা কয়েকবার কথা হয়েছে, তবুও মনে ও যে আমার সহদোর। ফারুক আহমেদ আমাকে সেই আস্থার তৈরি করে দিয়েছে, দেশ নয় কাছে নয় দর থেকেও কাছে থাকা যায় মানুষকে সম্পর্কে বাঁধা যায় আপন করা যায়।

 

ফারুক আহমেদের সাথে আমাকে যে মানুষটি সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিল সে এই পৃথিবীতে নেই, করোনাকালে হারিয়ে গেছে আ হ ম ফয়সাল।
ওর বাঁধা সূতোয় আমরা দুই দেশের দুজন আমি রোকেয়া ইসলাম আর ফারুক আহমেদ এখনও আঁটকে আছে ভালোবাসায় স্নেহে শ্রদ্ধায় সৃজনে।
ফারুক আহমেদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে, উদার আকাশের বিশাল সৃষ্টির জমিন ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়কে এগিয়ে আনতে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতে হবে শুদ্ধতায়।
বেঁচে থাকুক উদার আকাশ সাহিত্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই আলোকবর্তিকা আগামী প্রজন্মের পথও আলোকিত করুক।