এম এ রহিমকে একুশে পদকের জন্য বিবেচনা করা হোক, প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার মূল্যায়ন জরুরি

ড. আজিজুল আম্বিয়া   লন্ডন, লন্ডনের ব্রিক লেনে দাঁড়ালে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে বাংলা অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড, বাঙালির দোকানপাট, পরিচিত খাবারের ঘ্রাণ আর মানুষের মুখে মাতৃভাষার শব্দ।....

ড. আজিজুল আম্বিয়া

 

লন্ডন, লন্ডনের ব্রিক লেনে দাঁড়ালে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে বাংলা অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড, বাঙালির দোকানপাট, পরিচিত খাবারের ঘ্রাণ আর মানুষের মুখে মাতৃভাষার শব্দ। মনে হয়, দূরদেশের এই নগরে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই দৃশ্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, সামাজিক উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়জুড়ে রয়েছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের অধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্ন। সেই অধ্যায়ে এম এ রহিমের ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাঁকে একুশে পদকের জন্য বিবেচনা করার দাবি উঠতে পারে।

১৯৯০ সালে প্রথম লন্ডনে এসে পূর্ব লন্ডনের ব্র্যাডি স্ট্রিটে বসবাস শুরু করি। তখনকার লন্ডন আর আজকের লন্ডন এক নয়। প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। ব্রিক লেনের বাংলা সাইনবোর্ড আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়ের অভিজ্ঞতা। বিদেশের মাটিতে বাংলা অক্ষরের উপস্থিতি মনে করিয়ে দিয়েছিল, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের আত্মপরিচয়েরও ভিত্তি।

পরে জানতে পারি, পূর্ব লন্ডনে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় রাজনীতিকদের ভূমিকা ছিল। এম এ রহিম তাঁদের মধ্যে একজন, যাঁর রাজনৈতিক জীবন ও সামাজিক অবদান নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

 

 

একুশের চেতনা প্রবাসেও প্রাসঙ্গিক

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছে, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা পেয়েছে অনন্য ঐতিহাসিক মর্যাদা। সেই চেতনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

একুশের তাৎপর্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা মাতৃভাষার চর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক উদ্যোগ এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এই উত্তরাধিকার বহন করছেন। তাঁদের কাছে বাংলা ভাষা একই সঙ্গে স্মৃতি, শিকড় ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

বিদেশের মাটিতে একটি ভাষাকে টিকিয়ে রাখা শুধু পারিবারিক আবেগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শিক্ষা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। যে জনগোষ্ঠী স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির দাবিও জনপরিসরে তুলে ধরার সুযোগ বাড়ে।

পূর্ব লন্ডনের বাঙালি সমাজের বিকাশ বুঝতে হলে তাই স্থানীয় রাজনীতিতে বাঙালিদের অংশগ্রহণের ইতিহাসও জানতে হবে। এম এ রহিমের ভূমিকা সেই ইতিহাসের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

 

ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষরের পেছনের ইতিহাস

ব্রিক লেনের বাংলা সাইনবোর্ডকে কেবল দোকানের নামফলক হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এগুলো প্রবাসী বাঙালির দৃশ্যমান পরিচয়ের অংশ। লন্ডনে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর কাছে বাংলা অক্ষর তার পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি পথ হতে পারে। সদ্য আসা কোনো অভিবাসীর কাছে তা স্বস্তি ও আপনজনের অনুভূতি জাগাতে পারে।

তবে এই পরিচয় প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব কোনো একজনের নয়। এর পেছনে রয়েছে বহু প্রজন্মের অভিবাসীর শ্রম, ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মীদের উদ্যোগ, সাংবাদিকদের ভূমিকা, সাংস্কৃতিক সংগঠকদের কাজ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অবদান।

এম এ রহিমের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো, এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাঁর নির্দিষ্ট অবদান কী ছিল এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সংশ্লিষ্ট সময়ের কাউন্সিলের নথি, সমসাময়িক সংবাদপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননার দাবি যতটা আবেগের, ততটাই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার। তাই তাঁর অবদানের পক্ষে প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ এবং তা জনসমক্ষে উপস্থাপন করা জরুরি।

 

 

কেন একুশে পদকের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ

একুশে পদক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদকের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সেই বিবেচনায় বিদেশে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের কাজও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত।

এম এ রহিমের পক্ষে একুশে পদকের দাবি তিনটি বৃহত্তর বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রথমত, এটি প্রবাসে বাংলা ভাষার ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন। বাংলা ভাষার বিকাশ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস শুধু বাংলাদেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসেও ভাষাটিকে জনপরিসরে দৃশ্যমান রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এটি অভিবাসী বাঙালির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রশ্ন। পূর্ব লন্ডনে বাঙালিদের সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিকাশে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের কাজ নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। এম এ রহিমের অবদান সেই মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, এটি নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করার প্রশ্ন। আজকের তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বেড়ে উঠছে, তার ভিত্তি নির্মাণে পূর্ববর্তী প্রজন্মের ভূমিকা ছিল। সেই ইতিহাস জানলে তারা বুঝতে পারবে, পরিচিতির প্রতিটি দৃশ্যমান চিহ্নের পেছনে রয়েছে মানুষের শ্রম ও সংগ্রাম।

 

 

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অবদানের মূল্যায়ন

এম এ রহিমের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। ব্রিটেনে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক কাজগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বিবেচনা করা উচিত।

একজন রাজনীতিক নির্বাচনে সফল হয়েছেন কি না, কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন কি না, তা দিয়ে তাঁর সামগ্রিক সামাজিক অবদান নির্ধারণ করা যায় না। আবার রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ রাষ্ট্রীয় সম্মাননার যোগ্য হয়ে যান না। প্রয়োজন কাজের গুরুত্ব, স্থায়িত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং প্রামাণ্য মূল্যায়ন।

এম এ রহিমের ক্ষেত্রেও এই নীতির ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়। তাঁর অবদানের পক্ষে প্রমাণ যত শক্তিশালী হবে, একুশে পদকের জন্য তাঁর দাবি তত গ্রহণযোগ্য ভিত্তি পাবে।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বেও ভূমিকা রাখেন। তাঁদের অনেকের উদ্যোগে বিদেশের বিভিন্ন শহরে বাংলা ভাষার চর্চা, সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এগিয়েছে। এই অবদান বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসেরও অংশ।

 

 

এম এ রহিমের কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে যদি দেখা যায়, প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিকাশে তাঁর অবদান একুশে পদকের মানদণ্ড পূরণ করে, তাহলে তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হোক। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর অবদানের প্রামাণ্য বিবরণ ও প্রয়োজনীয় দলিল উপস্থাপন করা দরকার।

আমার কাছে এই দাবি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ নয়। এটি প্রবাসে বাংলা ভাষার ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান। একই সঙ্গে এটি এমন একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে: বাংলাদেশের বাইরে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান আমরা কীভাবে জাতীয় ইতিহাসে স্থান দেব?

ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষার শিকড় মানুষের সঙ্গে ভ্রমণ করে। দেশ থেকে দূরে গিয়েও মানুষ তার মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চায়। সেই প্রচেষ্টায় যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।

 

 

এম এ রহিমের অবদান নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হোক। প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর কাজ একুশে পদকের যোগ্য বলে বিবেচিত হলে তাঁকে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হোক। এতে একজন ব্যক্তির কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও যথাযথ গুরুত্ব পাবে।

একুশের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে, ভাষার মর্যাদা রক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষারই অংশ। সেই চেতনা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে লন্ডনের ব্রিক লেনেও বেঁচে আছে। এই ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা ভাষাশহীদদের উত্তরাধিকারকে আরও বিস্তৃত অর্থে ধারণ করতে পারি।