জল ফুটিয়ে খেলেই নিশ্চিন্ত? টাইফয়েড, ডায়েরিয়া ঠেকানোর সঠিক নিয়ম জানুন

স্বচ্ছ জল, নেই কোনও গন্ধ, দেখতেও পরিষ্কার। তা হলেই নিশ্চিন্তে পান করা যায়? উত্তরটা হল, না। কারণ, চোখে দেখা যায় না এমন রোগজীবাণুও মিশে থাকতে পারে পানীয় জলে। আর সেখান....

স্বচ্ছ জল, নেই কোনও গন্ধ, দেখতেও পরিষ্কার। তা হলেই নিশ্চিন্তে পান করা যায়? উত্তরটা হল, না। কারণ, চোখে দেখা যায় না এমন রোগজীবাণুও মিশে থাকতে পারে পানীয় জলে। আর সেখান থেকেই শরীরে ঢুকতে পারে টাইফয়েড, কলেরা, ডায়েরিয়া বা হেপাটাইটিস এ-র মতো সংক্রমণ।

পানীয় জলের নিরাপত্তা নিয়ে এই আশঙ্কার মধ্যেই মুম্বইয়ের একাধিক এলাকায় জল ফুটিয়ে পানের  পরামর্শ দিয়েছে পুরসভা। নির্দেশটি ঘিরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জল ফুটিয়ে নিলেই কি সব সংক্রমণ থেকে রেহাই মেলে?

 

কেন সতর্কতা?
মুম্বইয়ের পিসে-পাঞ্জরাপুর জল সরবরাহ প্রকল্পের অন্তর্গত ইয়েওয়াই মাস্টার ব্যালান্সিং রিজার্ভারের মেরামতির কাজ শেষ হওয়ার পর সেটি আজ, ২৮ অক্টোবর, বুধবার পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই সময়ে জল সরবরাহের গুণমানে পরিবর্তন হতে পারে বলে সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছে প্রশাসন। মুম্বই শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার বাসিন্দাদের আগামী সাত দিন পানীয় জল ফুটিয়ে ও ছেঁকে খেতে বলা হয়েছে।

 

তবে এই নির্দেশিকার অর্থ এই নয় যে, শহরের সর্বত্র জল দূষিত হয়েছে বা কোনও জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। জল সরবরাহের ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার সময়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখেই এই সতর্কতা। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পুরসভার নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে।

Hot water benefits and boiled drinking water safety
পানের আগে নিশ্চিত হোন। ছবি: সংগৃহীত

জল থেকে কী কী রোগ হতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জীবাণু মিশে থাকা জল থেকে ডায়েরিয়া, কলেরা ও টাইফয়েড-সহ একাধিক সংক্রমণ ছড়াতে পারে। দূষিত জলের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী শরীরে প্রবেশ করলে পেটব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, জ্বর ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হেপাটাইটিস এ-র সংক্রমণে যকৃত আক্রান্ত হয়। সে ক্ষেত্রে জ্বর, বমি বমি ভাব, খিদে কমে যাওয়া এবং চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকদের কথায়, দূষিত জল থেকে হওয়া বমি ও ডায়েরিয়ার অন্যতম বড় সমস্যা হল শরীর থেকে জল ও প্রয়োজনীয় নুন বেরিয়ে যাওয়া। সময়মতো সেই ঘাটতি পূরণ না হলে জলশূন্যতা দেখা দিতে পারে। বিশেষত শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জল ফুটিয়ে খেলে কতটা সুরক্ষা?
পানীয় জলে থাকা অধিকাংশ রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী ধ্বংস করার কার্যকর উপায় হল জল ফুটিয়ে নেওয়া। তবে জল শুধু গরম করলেই হবে না। মার্কিন সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, পরিষ্কার জল টগবগ করে অন্তত এক মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। তার পর ঠান্ডা করে পরিষ্কার, ঢাকা দেওয়া পাত্রে রাখতে হবে।

ফুটিয়ে নেওয়ার পরেও জলের নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি। অপরিষ্কার পাত্রে জল রাখলে, নোংরা হাতে ধরলে বা ব্যবহৃত গ্লাস জলের মধ্যে ডোবালে ফের জীবাণু মিশতে পারে। তাই জল ফুটিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণের নিয়মও মানতে হবে।

তবে জল ফুটিয়ে নিলেই সব ধরনের দূষিত পদার্থ দূর হবে, এমনটা নয়। জলে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ মিশে থাকলে শুধু ফোটানোয় সেগুলি দূর হবে না। অর্থাৎ, জীবাণুর কারণে হওয়া দূষণ কমাতে জল ফোটানো কার্যকর হলেও জলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিটি সমস্যার সমাধান এটি নয়।

Boiled water for preventing waterborne diseases
বড্ড ভোগায় জলবাহিত অসুখ। ছবি: সংগৃহীত

বাড়ির জল পরিশোধক কি যথেষ্ট?
বাড়িতে আরও (RO), ইউভি ব্যবহার করেন অনেকেই। কিন্তু সব জল পরিশোধক একই ধরনের দূষিত পদার্থ দূর করতে পারে না। যন্ত্রের প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলে কী ধরনের দূষিত পদার্থ রয়েছে, তার উপর নির্ভর করে তার কার্যকারিতা।

তাই বাড়িতে জল পরিশোধক থাকলেই যে সব ধরনের রোগজীবাণু থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা মিলবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনও এলাকায় প্রশাসন বিশেষ সতর্কতা জারি করলে সেই নির্দেশ মেনে চলতে হবে। মুম্বইয়ের ক্ষেত্রে যেমন জল ফুটিয়ে ও ছেঁকে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তেমন নির্দেশকে অবহেলা করা উচিত নয়।

কোন লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
বারবার পাতলা পায়খানা, বমি, পেটে মোচড়, জ্বর বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। ডায়েরিয়া ও বমির কারণে শরীরে জল এবং নুনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা জলশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে।

ডায়েরিয়া বা বমি দীর্ঘক্ষণ চললে, বেশি জ্বর এলে, পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে, পেটে তীব্র ব্যথা হলে বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জল খেলেই বমি হয়ে গেলে, অজ্ঞান হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপসর্গ বাড়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ভালো।

Mumbai civic advisory on drinking boiled water
নিরাপদ পানীয়। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিনের কয়েকটি অভ্যাসই দেবে সুরক্ষা
পানীয় জল নিরাপদ রাখার জন্য কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন-

  • পান করা, দাঁত মাজা এবং রান্নার কাজে নিরাপদ জল ব্যবহার করুন
  • প্রশাসনের নির্দেশ থাকলে জল ফুটিয়ে নিন
  • ফুটিয়ে নেওয়া জল পরিষ্কার, ঢাকা দেওয়া পাত্রে রাখুন
  • জল তোলার সময় হাত বা ব্যবহৃত গ্লাস পাত্রের ভিতরে ডোবাবেন না
  • জলের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং খাবার তৈরির আগে হাত ধুয়ে নিন।