ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাস চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াইয়ের এক প্রধান ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও রাজনৈতিক অবদানকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যসরকার৷ একই সাথে মুঘল ইতিহাসের পরিধি ছোট করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে৷ এই ঘটনা রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তটিকে নিছক শিক্ষাগত সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত আধিপত্য বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলেরই একটি অংশ।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী, ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির একাংশের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে, বাংলার মূল ধারার ইতিহাস ও শিক্ষায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বর্তমান পরিবর্তনের বাংলায় পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনসংগ্রাম ও আদর্শকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার এই পদক্ষেপটি সেই ঐতিহাসিক আক্ষেপ দূর করার একটি প্রয়াস হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, পাঠ্যক্রমে মুঘল ইতিহাসের পরিধি বা বিবরণ সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্তটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মধ্যযুগীয় ভারতের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়কে পাঠ্যসূচি থেকে ছেঁটে ফেলা বা সংকুচিত করার অর্থ হলো শিক্ষার্থীদের ইতিহাস সম্পর্কে একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও খণ্ডিত ধারণা প্রদান করা।
এই পুরো ঘটনার পেছনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা কাজ করছে। গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মূল আদর্শিক উৎস ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’ (RSS)-এর প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলায় নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পুনর্লিখনের ওপর জোর দিয়ে এসেছে। বিজেপি ও সমমনস্ক গোষ্ঠীগুলো বহু দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, বামপন্থী শাসনের দীর্ঘ মেয়াদে বাংলার পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বিশেষ একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে, যেখানে ডানপন্থী বা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের নায়কদের ব্রাত্য রাখা হয়েছে।
এই পটভূমিতে, পাঠ্যপুস্তকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তর্ভুক্তি এবং মুঘল ইতিহাস ছাঁটাইয়ের নীতিগত প্রবণতা একদিকে যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি বড় আদর্শিক বিজয়, অন্যদিকে তা বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে ক্ষমতার ভারসাম্যের বদলকেই নির্দেশ করে। এর ফলে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও মেরুকরণ তীব্রতর হচ্ছে।
শিক্ষানীতিতে এই ধরনের পরিবর্তন কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। শৈশব ও কৈশোর থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক চরিত্র ও মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য তৈরি করার এই প্রচেষ্টা বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও বেশি সংঘাতময় করে তুলতে পারে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ও উদারনৈতিক ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে যখন সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায়, তখন তা সমাজে বিভাজনের রেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার পাঠ্যপুস্তকে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও মুঘল ইতিহাসের রদবদল নিছক সিলেবাস পরিবর্তনের কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি বাংলার মাটিতে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। ইতিহাসকে নিজেদের অনুকূলে পুনর্লিখন করার এই রাজনীতি আগামী দিনে বাংলার ছাত্রসমাজ এবং বুদ্ধিজীবী মহলকে আরও গভীরভাবে বিভক্ত করবে বলেই আশঙ্কা হয়৷