কবি হাসসান বিন সাবিত (রাঃ)-র নবীপ্রেম

মদুদ আহমেদ আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে যে সমস্ত কবিগণ নিজের কবিতা দ্বারা আরবী কবিতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জাহেলি ও ইসলামী যুগের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে সাহাবি কবি হাসসান বিন সাবিত....

মদুদ আহমেদ

আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে যে সমস্ত কবিগণ নিজের কবিতা দ্বারা আরবী কবিতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জাহেলি ও ইসলামী যুগের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে সাহাবি কবি হাসসান বিন সাবিত রাঃ হলেন অন্যতম কবি। নবী সাঃ এর ইন্তিকালে বিশ্ববাসী বিশেষ করে মদীনার সাহাবীগণ সবচেয়ে শোকাহত ও বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। যেহেতু কবি হাসসান বিন সাবিত নবী সাঃ এর সব সময়ের সঙ্গী ছিলেন তাই বিচলিত হওয়ারটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।তিনি বিশ্বনবীর মৃত্যুতে নিজের জীবনকে নিয়ে চুড়ান্ত হতাশার স্বীকার হয়ে পড়েন। কবি হাসসান বিন সাবিত রাঃ কে বলা হয় ‘শায়িরুর রসূল’ বা রসূলের কবি।
পৃথিবী একটি মরিচীকা একদিন প্রত্যেক প্রাণকেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে ‘কুল্লু নাফসিন যা ইক্বাতুল মাঊত’ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই চির সত্য কথাটি জানা সত্বেও মানুষ নিজের প্রিয়জনদের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাহত, হতাশাগ্রস্ত ও ব্যথিত হয়ে পড়েন। তাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মাহ অর্থাৎ মদীনার সাহাবীগণও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না!

 

 

রাসূল সাঃ এর মৃত্যুতে মদীনার সাহাবীগণ নিজের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় জগৎকে নিয়ে চুড়ান্ত ভাবে ভেঙে পড়েন। তাঁদের হাস্যোজ্জ্বল চেহেরাগুলি বিবর্ণ ও কালো হয়ে গিয়েছিল। কবি হাসসান বিন সাবিত রাসূলের ইন্তিকালের পর এই মানষিক যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে কখনো তিনি নবী সাঃ এর আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন, কখনো সাপের বিষ খেয়ে মারা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন আবার কখনও আক্ষেপের সুরে একথা বলে ফেলেছেন যে, যদি আমার জন্মই না হতো তাহলে আজ রাসূলের মৃত্যুর এই যন্ত্রনা আমাকে সহ্য করতে হতনা।

 

 

যেহেতু নবী সাঃ মদীনার রমনী আমেনা রাঃ আনহার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়টা সেখানেই অতিবাহিত করেছেন, তাই অন্যদের তুলনায় মদীনা বাসীর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর মৃত্যুতে অন্যদের তুলনায় বেশি ব্যথিত হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাই মদীনাবাসী ও রাসূলের চির সঙ্গী কবি হাসসান নিজের জীবন ও মদীনার সাহাবীগণের যন্ত্রনার বর্ণণা দিতে গিয়ে তিনি কবিতা রচনা করেছেন ‘আল- মারসিয়্যাহ’ বা শোকগাঁথা।

 

পূর্ণ ইসলামের আগমনের পূর্বে নবী সাঃ এর আমলে কুরাইশরা এবং পুরো আরবের গোত্রগুলো প্রতি বছর কয়েকটা বড় মেলার আয়োজন করত। এর মধ্যে ৩টা সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল: ১)জুল-মাজাজ মেলা ২)মাজান্না মেলা ৩)উকাজ মেলা।
তবে কুরাইশদের সবচেয়ে বিখ্যাত মেলার নাম ছিল উকাজের মেলা।
এটি প্রতি বছর জিলক্বদ মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত মক্কা থেকে ৪০ মাইল দূরে অবস্থিত উকাজ উপত্যকায় কুরাইশদের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘উকাজ’ এর মেলা বসত। সেই উকাজের মেলায় কবিতা প্রতিযোগিতা, সাহিত্য পাঠ প্রভৃতি আসরের আয়োজন করা হতো‌। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্য, শান্তি চুক্তি সব হতো।

 

এখানে তৎকালীন সময়ের কবিগণ কবিতা পাঠ করে শোনাত। এবং অমুসলিম কবিরা কবিতার মাধ্যমে ইসলামকে নিয়ে বিদ্রুপ করত। সেই বিদ্রুপের প্রতুত্তরে কবি হাসসান কবিতার মাধ্যমে অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের জবাব দিতেন। এখানে খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো এই উকাজের মেলায় কুরাইশদের নেতা, ব্যবসায়ী, কবি, সাহিত্যিক ও সাধারন মানুষ সকলেই আসত। এখানেই আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপকভাবে উৎকর্ষ সাধন হয়েছিল। নবী মুহাম্মদ (সা.) ছোটবেলায় এই মেলাগুলোতে গিয়েছেন।

 

কবি হাসসান বিন সাবিত রাঃ ইসলামের আগমনের পূর্বে তিনি আরবের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন মদিনার খাযরাজ গোত্রের সন্তান। তৎকালীন সময়ে তিনি রাজা-বাদশাহদের প্রশংসায় ‘মাদিহ’ বা ‘প্রশংসামূলক কবিতা’ রচনা করতেন। তার কবিতা ছিল ইসলামের ঢাল স্বরুপ। কুরাইশদের কটাক্ষের জবাব তিনি কবিতার মাধ্যমেই দিতেন।কবি হাসসান ছিলেন জাহেলি যুগের একজন কবি। কিন্তু তিনি অমর হয়ে আছেন ইসলামি যুগের খ্যাতনামা কবি হিসেবে।

এককথায় বলতে গেলে, কবি হাসসান বিন সাবিত রা. ছিলেন ইসলামের প্রথম সাংবাদিক। তরবারি দিয়ে নয়, বরং কলম আর কবিতা দিয়ে তিনি কাফেরদের কটুক্তির জবাব দিয়েছিলেন এবং তিনি এভাবেই ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কবিতাকে খুব সহজেই চেনার উপায় হলো- কবিতার লাইনের শেষে আরবী বর্ণ দাল (د) রয়েছে।

 

কবি হাসসান বিন সাবিত রাঃ এর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল –
১. ফাখরিয়্যাহ বা গৌরবগাঁথা মূলক কবিতা: এর মাধ্যমে তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের গৌরবকে তুলে ধরেছিলেন।
২. হিজা বা নিন্দা মূলক কবিতা: এর দ্বারা তিনি কাফের ও মুনাফিকদের কটাক্ষ ও নিন্দার জবাব দিয়েছিলেন।
৩. মাদিহ বা প্রশংসামূলক কবিতা: এর মাধ্যমে তিনি রাসুল (সা.) এর প্রশংসা করতেন।
৪. মারসিয়্যাহ: এর দ্বারা তিনি ওহুদ, বদরের শহীদদের নিয়ে শোকগাঁথা মূলক কবিতা রচনা করেছিলেন।

আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে কবি হাসসান বিন সাবিতের অবদান চিরস্মরণীয়।