কানাই দাস
নজরুলবর্ষ।বাংলাদেশ ,ভারতবর্ষ সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে নজরুলকে নিয়ে নানা অনুষ্ঠান, আলোচনা ও স্মরণপর্ব চলছে। উদ্দেশ্য একটাই-নতুন প্রজন্মের কাছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম ও আদর্শকে নতুন করে তুলে ধরা। কিন্তু নজরুলকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর বিদ্রোহী কবিতা, সাম্যবাদী ভাবনা কিংবা দেশপ্রেমের কবিতার মধ্যে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ইসলামি ভাবধারার কবিতা ও গান। সেই দিকটিও আমাদের ভালোভাবে দেখা দরকার।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ইসলামি রচনার সংখ্যা কম নয়। ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’, ‘শহিদী ঈদ’, ‘খালেদ’, ‘উমর-ফারুক’, ‘নতুন চাঁদ’, ‘মোবারকবাদ’, ‘কৃষকের ঈদ’, ‘মোহররম’, ‘বকরীদ’, ‘আজান’, ‘মৌলভীসাহেব’, ‘আল্লা পরম প্রিয়তম মোর’, ‘আনোয়ার’, ‘শাতিল-আরব’ প্রভৃতি রচনায় ইসলামি ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, উৎসব, চরিত্র ও ঐতিহ্য নানা ভাবে উঠে এসেছে। এসব রচনার সবগুলির কাব্যগুণ সমান নয় ,কিছু রচনা দীর্ঘ ও বিবৃতিমূলক। তবু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
নজরুলের ইসলামি কবিতাকে শুধু ধর্মীয় কবিতা হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যিক অবদানকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তাঁর কবিতায় ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে আরবি-ফারসি শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প ও ছন্দ। এর ফলে বাংলা কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার নজরুলের একটি বড় অবদান। ‘ফিরদৌস’, ‘কওসর’, ‘হুর’, ‘নূর’, ‘জুলফিকার’, ‘রূহ’, ‘মুনাজাত’, ‘সিজদা’, ‘কাফন’, ‘মুয়াজ্জিন’, ‘ঈমান’, ‘ফরমান’, ‘মজলুম’ ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ তিনি এমনভাবে কবিতায় ব্যবহার করেছেন যে সেগুলি বাংলা কাব্যভাষারই অংশ হয়ে উঠেছে।
এখানেই নজরুলের কৃতিত্ব। তিনি বাংলা কবিতার পরিচিত পরিসরের বাইরে গিয়ে আরব ও পারস্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কল্পলোককে বাংলা ভাষার মধ্যে নিয়ে এসেছেন। ফলে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা শব্দ ভান্ডার।
নজরুল শুধু শব্দ ও ভাবের ক্ষেত্রেই নতুনত্ব আনেননি, ছন্দের ক্ষেত্রেও নানা পরীক্ষা করেছেন। আরবি-ফারসি ছন্দের রীতিকে বাংলায় ব্যবহার করার চেষ্টা তাঁর কবিতার একটি বিশেষ দিক। ‘দোদুল দুল’ কবিতার মতো রচনায় সেই ছন্দের পরীক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়। হজয্, রবজ্, রমল, মোতাকারের , ওয়াফের, তবীল, মদীদ, বসীত প্রভৃতি আরবি ছন্দরীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল এবং সেগুলিকে বাংলা কবিতায় প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।
ইসলামি সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে নজরুলের আর একটি বড় গ্রহণ হলো গজল। বাংলা ভাষায় গজলকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আবার ‘রুবাইয়াত-ই-হাফিজ’-এর মাধ্যমে ফারসি কবিতার স্বাদও তিনি বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর অনুবাদ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার পাঠক হাফিজের কাব্যজগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
নজরুলের ইসলামি কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। নজরুলকে শুধু মুসলমানের কবি কিংবা শুধু হিন্দুর কবি ,কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তাঁর সাহিত্যজুড়ে যেমন ইসলামি ঐতিহ্য আছে, তেমনি আছে হিন্দু পুরাণ, দেবদেবী, শাক্ত-বৈষ্ণব ভাবনা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান। এই দুই ধারাকে পাশাপাশি নিয়ে চলার মধ্যেই তাঁর বিশেষত্ব।
নিজের সমাজ ও ঐতিহ্যকে জানা এবং তাকে সাহিত্যে প্রকাশ করা মানেই অন্যের প্রতি বিদ্বেষ নয়। বরং নিজের পরিচয়কে ধারণ করেই বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যায়। নজরুলের সাহিত্য সেই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ইসলামি কবিতাগুলিকে তাই শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ হিসেবে না দেখে বাংলা সাহিত্যে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংযোজন হিসেবেও দেখা দরকার।
তবে এটাও সত্য, নজরুলের সব রচনা একই মানের নয়। অনেক সময় তাঁর প্রবল আবেগ তাঁকে দ্রুত লেখার দিকে নিয়ে গেছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অনুরোধের সূত্রে লেখা কিছু রচনায় সেই তাৎক্ষণিকতার ছাপ রয়েছে। ফলে তাঁর ইসলামি কবিতার মধ্যে যেমন অসাধারণ কাব্যিক সৃষ্টির পরিচয় আছে, তেমনি কিছু অপেক্ষাকৃত দুর্বল রচনাও রয়েছে।
কিন্তু কয়েকটি দুর্বল রচনার কারণে পুরো ইসলামি সাহিত্যভাণ্ডারকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। একজন বড় কবিকে বিচার করতে হলে তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে দেখতে হয়। নজরুলের ইসলামি কবিতা বাংলা ভাষার পাঠককে একটি নতুন শব্দভাণ্ডার, নতুন ইতিহাস, নতুন চিত্রকল্প এবং নতুন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
নজরুলের ইসলামি কবিতার সবচেয়ে বড় মূল্য সম্ভবত এখানেই। তিনি বাংলা সাহিত্যকে কোনো একটি ধর্মীয় সংস্কৃতির মধ্যে আটকে রাখেননি। বরং বাংলা ভাষার ভেতরে নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাকে পাশাপাশি নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাছে বিদ্রোহ যেমন সত্য, তেমনি প্রেমও সত্য; সাম্য যেমন সত্য, তেমনি নিজের ঐতিহ্যের প্রতি টানও সত্য।
তাই নজরুলকে বুঝতে হলে শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নজরুলকে জানলেই হবে না। ‘আজান’-এর নজরুলকে, ‘মোহররম’-এর নজরুলকে, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’-এর নজরুলকে, গজল ও রুবাইয়াতের নজরুলকেও জানতে হবে। তবেই তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা কিছুটা বোঝা সম্ভব হবে।
নজরুলের ইসলামি কবিতা কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়, বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর ভাণ্ডারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই অংশকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা দরকার। কারণ নজরুলকে যত বেশি পড়া যাবে, ততই বোঝা যাবে-বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কত বিচিত্র সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।
তথ্যসূত্র:
১. আবদুল কাদির ,নজরুল প্রতিভার স্বরূপ ,নজরুল ইন: ঢাকা ১৯৮৯।
২. রফিকুল ইসলাম , কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন ,নজরুল ইন: ঢাকা ২০১২।
৩. অরুণ কুমার বসু ও রফিকুল ইসলামের নজরুল জীবনী, এছাড়া নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা