উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারবিভাগীয় ভূমিকার তীব্র সমালোচনা সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির

নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারবিভাগের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দীপক গুপ্ত। উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাস এবং এলগার পরিষদ মামলার মতো উদাহরণ টেনে তিনি মন্তব্য....

নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারবিভাগের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দীপক গুপ্ত। উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাস এবং এলগার পরিষদ মামলার মতো উদাহরণ টেনে তিনি মন্তব্য করেছেন, বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়াই সাজা দেওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে (প্রসেস হ্যাজ বিকাম দ্য পানিশমেন্ট)।বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেশবিরোধী তকমা দিয়ে তাঁদের জীবন তছনছ করে দেওয়া হচ্ছে বলেও তোপ দাগেন তিনি। ​প্রাক্তন এই বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “প্রশাসনের আনা অভিযোগগুলি যদি সত্যিই এতটাই গুরুতর হয়, তবে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা বা প্রসিকিউশনের সেই একই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না কেন?”

 

​সম্প্রতি দ্য ট্রাইবুন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ’ (দ্য ট্রু মিনিং অব ফ্রিডম) শীর্ষক একটি প্রবন্ধে বিচারপতি গুপ্ত লিখেছেন, “স্বাধীনতা মানে কেবল বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নয়; প্রতিটি নাগরিক যাতে ভয়হীন ভাবে চিন্তা করতে ও কথা বলতে পারেন, নিজেদের ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন এবং জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার পান তা সুনিশ্চিত করাই স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ।” ​তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত কেবল তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পারবে, যখন দেশ থেকে দুর্নীতি, পক্ষপাত, অন্ধ গোঁড়ামি এবং অসহিষ্ণুতা পুরোপুরি নির্মূল হবে।

 

​আইন পেশায় প্রায় অর্ধশতক কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিচারপতি গুপ্ত বলেন, বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আইনি জগতের ভূমিকার ওপরই তিনি মূল আলোকপাত করছেন। তাঁর কথায়, “যাবৎকাল একটি স্বাধীন ও নির্ভীক বিচারবিভাগ গড়ে না উঠছে, তত দিন কোনো দেশ নিজেকে স্বাধীন বলে দাবি করতে পারে না।” ​তিনি স্পষ্ট করেন, এর জন্য এমন বিচারকদের প্রয়োজন যাঁদের রয়েছে সততা, বুদ্ধিমত্তা এবং অনন্য মেরুদণ্ড যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং কোনো ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া বিচার দেওয়ার শক্তি যোগায়। উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা তুলে ধরে বিচারপতি গুপ্ত জানান, সংবিধান স্বীকৃত এই আদালতগুলি কেবল নানা বিরোধের নিষ্পত্তি করে না, বরং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও তা অক্ষুণ্ণ রাখার গুরুদায়িত্বও এদের ওপর ন্যস্ত।

 

​তবে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংবিধানিক আদালতগুলি নাগরিক অধিকার রক্ষায় “প্রয়োজনীয় সংবেদনশীলতা বা দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অধিকারকে এখন স্বচ্ছন্দে লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালত কেবল নীরব দর্শক হয়ে রয়ে গিয়েছে। ​জরুরি অবস্থার সময়ে বিখ্যাত ‘এডিএম জবলপুর’ মামলায় বিচারপতি এইচ আর খান্নার ঐতিহাসিক ভিন্নমতের (ডিসেন্ট) কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। খান্না তাঁর রায়ে লিখেছিলেন, জরুরি অবস্থার মধ্যেও আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো নাগরিককে তাঁর মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

 

​এর পরেই জামিন ও দীর্ঘ প্রাক-বিচার বা বিচারাধীন কারাবাস প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন প্রাক্তন বিচারপতি। আইনি জগতে ‘জামিনই নিয়ম, জেল নয়’ (বেল, নট জেল, ইজ দ্য রুল) কথাটি বহুল প্রচলিত হলেও, বাস্তবে ‘জেলই নিয়ম, জামিন নয়’ রূপ নিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ তাঁর। দেশের কারাগারগুলির পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমান বন্দিদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিচারাধীন এবং মাত্র ২৪ শতাংশ দণ্ডপ্রাপ্ত। প্রতি এক জন সাজাপ্রাপ্ত আসামির বিপরীতে তিন জন বিচারাধীন বন্দি বন্দি রয়েছেন- এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও মর্মান্তিক বলে অভিমত তাঁর।

 

এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উমর খালিদের প্রসঙ্গের অবতারণা করেন বিচারপতি গুপ্ত। তিনি লেখেন, “উমর খালিদ গত ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ এবং মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া এখনও শুরুই হয়নি। ওঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার কিংবা দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের কী হলো?” ​বিচারপতি গুপ্ত উল্লেখ করেন, পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই অন্য এক রায়ে উমর খালিদের মামলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ​এর পর তিনি এলগার পরিষদ মামলার উদাহরণ দিয়ে জানান, অভিযুক্তদের বছরের পর বছর ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে এবং এক জনের জেলেই মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে; অথচ ঘটনার আট বছর পরেও মূল বিচারপ্রক্রিয়া শুরুই করা যায়নি।

 

​তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী অভিযোগগুলি যদি সত্যিই এতটাই গুরুতর হয়, তবে বিচারে কেন এই চরম কালক্ষেপ? প্রসিকিউশন পক্ষ শুরু থেকেই কেন সমান তৎপরতা দেখায়নি? ​বিচারপতি গুপ্ত আক্ষেপের সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “আইনি প্রক্রিয়াই এখন শাস্তিতে পরিণত হয়েছে।” বিভিন্ন মানুষকে স্রেফ দেশবিরোধী তকমা দিয়ে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে এবং তাঁদের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, আর আদালতগুলি তাঁদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।

 

​পাশাপাশি, জলবায়ু আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুকের আটকের বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রাক্তন বিচারপতি। ওয়াংচুকের হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বারবার দিন পিছানোর (অ্যাডজার্নমেন্ট) কড়া সমালোচনা করেন তিনি। ​বিচারপতি গুপ্তের মতে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংক্রান্ত যে কোনো আবেদনের নিষ্পত্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করা আদালতের দায়িত্ব। তিনি বলেন, আটকাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও ওয়াংচুকের ওই আটক প্রক্রিয়াটি আইনি ভাবে বৈধ ছিল কি না, তা আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া উচিত ছিল।

 

​বিচারব্যবস্থার অভ্যন্তরে বৃদ্ধি পাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রাক্তন বিচারপতি গুপ্ত। তিনি লেখেন, গণতন্ত্র সংখ্যাধিক্যের নিরিখে পরিচালিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ- যেখানে অন্য পক্ষের কণ্ঠস্বরকে পুরোপুরি চেপে দেওয়া হয়, তা গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী। তাঁর বিস্ফোরক দাবি, “আদালতগুলি এখন স্তর নির্বিশেষে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের দিকেই চালিত হচ্ছে।” ​এই প্রসঙ্গে রাম জন্মভূমি ও জ্ঞানবাপী মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জ্ঞানবাপী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এমন এক আইনি বিতর্কের পথ প্রশস্ত করেছে যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্প্রীতি ও সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। পুরো পদক্ষেপটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠকে তোষণ করার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত বলে পর্যবেক্ষণ তাঁর।

 

জামিনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বিচারব্যবস্থার দ্বিমুখী আচরণের তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেন বিচারপতি গুপ্ত। তিনি লেখেন, গঙ্গায় নৌকায় বসে মুরগির মাংস খাওয়ার অপরাধে এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের মাসের পর মাস জামিন মেলেনি; অথচ একই নদীতে মদ্যপান করা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান। ​তিনি মন্তব্য করেন, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ সংবিধান প্রদত্ত বিচার, স্বাধীনতা, সমতা কিংবা ভ্রাতৃত্ববোধের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ​ভিন্নমত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে জোর সওয়াল করে প্রাক্তন এই বিচারপতি জানান, সরকার এবং তার গৃহীত নীতির সমালোচনা করা গণতন্ত্রের এক অপরিহার্য অঙ্গ। ​“সরকার আর দেশ কখনো এক বিষয় হতে পারে না,” মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, দেশ সর্বদাই শাসনবিভাগ, আইনসভা এবং বিচারবিভাগের ঊর্ধ্বে।

 

​উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থারও কড়া সমালোচনা করেন বিচারপতি গুপ্ত। এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অচ্ছ ও অস্পষ্ট (ওপেক) আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, উপযুক্ত ব্যাখ্যার অভাব রেখেই এই ব্যবস্থায় বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। উচ্চতর বিচারবিভাগে সামাজিক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে উচ্চবর্ণের বিচারকদের সংখ্যাধিক্যের দিকে ইঙ্গিত করে তাঁর মত, সুপ্রিম কোর্টে সমাজের সব স্তরের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব থাকা আবশ্যক। ​প্রবন্ধের উপসংহারে বিচারপতি গুপ্ত উল্লেখ করেন, বিচারকদের বৃহৎ অংশই সৎ ও নিষ্ঠাবান হলেও নানা অনিয়মে যুক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। জনমানসে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ স্তরে আত্মপর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি। তিনি সতর্ক করে দেন, সাধারণ মানুষ বিচারবিভাগের ওপর আস্থা হারালে এই স্তম্ভটি তার প্রাসঙ্গিকতা খোয়াতে পারে, যা গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য মৃত্যুর ঘণ্টা বাজিয়ে দেবে। প্রাক্তন বিচারপতি বলেন, ​“যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে মানুষ কখনোই মুক্ত বা স্বাধীন হতে পারে না।” সূত্র: মাকতুব