ভারতের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে পরিচিত কেরালার প্রবীণ সুন্নি ধর্মীয় নেতা শেখ আবুবকর আহমেদ-এর সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশের রাজনীতি এবং মুসলিম সমাজে নারী অধিকার সংক্রান্ত বিতর্ককে নতুন মোড় দিয়েছে। কোচিতে একটি সম্মেলনে তিনি মন্তব্য করেন যে, নারীদের ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং তাদের প্রকাশ্য জনজীবন থেকে দূরে রাখা আবশ্যক।
তিনি নারীদের সঙ্গে সোনা বা মূল্যবান অলংকারের তুলনা করে বলেন, সৌন্দর্য ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য যেমন সোনাকে বাক্সে সুরক্ষিত রাখতে হয়, তেমনই নারীদের সুরক্ষার জন্যও পর্দা প্রথা ও চার দেয়ালের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এর আগে নির্বাচনে নারী সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকারে আসন বরাদ্দ নিয়েও তার রক্ষণশীল অবস্থান বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
এই ধরনের মন্তব্য আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারী স্বাধীনতা, ধর্মে নারীর প্রকৃত অবস্থান এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নগুলোকে তীব্রভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ধর্মীয় পন্ডিতদের একটি রক্ষণশীল অংশ কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াতকে সার্বজনীন বিধান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেও ইসলামী নারীবাদী গবেষক ও প্রগতিশীল আলেমরা এর জোরালো প্রতিবাদ করে আসছেন। কুরআনের যে আয়াতটি সাধারণত পর্দা বা গৃহবন্দিত্বের পক্ষে দলীল হিসেবে টানা হয় , তা মূলত বিশেষভাবে মহানবী -এর স্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে অবতীর্ণ হয়েছিল।
ইসলামের ইতিহাসের প্রারম্ভিক যুগেই উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা -এর মতো ব্যক্তিত্ব জাবালের যুদ্ধ বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। সুতরাং, নির্দিষ্ট ও বিশেষ প্রেক্ষাপটের বিধানকে সমগ্র মুসলিম নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং জনজীবনে তাদের অংশগ্রহণকে ‘পতন বা ধ্বংসের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উভয় সত্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বিতর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নির্ণায়ক দিকটি হলো দেশের সংবিধান। যেকোনো ধর্মীয় গুরু বা সংগঠনের নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা পিতৃতান্ত্রিক ফতোয়া যাই হোক না কেন, তা কোনোভাবেই ভারতের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলোকে খর্ব করতে পারে না।
ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা (সমতার অধিকার) এবং ২১ নম্বর ধারা (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকার) দেশের সব নাগরিকের জন্য লিঙ্গভেদ নির্বিশেষে সমান অধিকার নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ কিংবা জনপরিসরে তাদের চলাফেরা সংক্রান্ত যেকোনো রক্ষণশীল ফতোয়া সাংবিধানিক অধিকারের গণ্ডির সামনে গৌণ হয়ে যায়। ভারতীয় গণতন্ত্রে ধর্মীয় আইন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই সাংবিধানিক সমতা এবং নারী অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে না।
শেখ আবুবকর আহমেদের মতো প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের রক্ষণশীল মন্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজে এখনও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে এক করে দেখার প্রবণতা প্রবল। একদিকে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব এবং স্বাবলম্বিতা এগিয়ে চলেছে, তখন এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক অগ্রগতিকে পিছনের দিকে টানার শামিল। তবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ধর্মীয় নেতার বিধান নারীর অগ্রযাত্রাকে স্থায়ীভাবে আটকাতে পারে না, যদি রাষ্ট্র ও সমাজ সম্মিলিতভাবে সাংবিধানিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখে।