৫৩ দিনে বিজেপির দপ্তরে অনুদান এসেছে প্রায় পনেরোশো কোটি টাকা,বিস্ফোরক অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে-র মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ১,৪৭২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। একই সময়ে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ইউনিট মিলিয়ে অনুদান ২০৭ কোটি....

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে-র মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ১,৪৭২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। একই সময়ে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ইউনিট মিলিয়ে অনুদান ২০৭ কোটি ১৭ লক্ষ। অর্থাৎ কংগ্রেসের তুলনায় শুধু বিজেপির কেন্দ্রীয় দপ্তরেই এসেছে সাত গুণেরও বেশি টাকা। বাংলা, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির ভোটের মধ্যেই রাজনৈতিক অনুদানের এই বিপুল ফারাক নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ভারতের নির্বাচনে টাকার জোর বাড়ছে কতটা?

 

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কনসলিডেটেড এক্সপেনডিচার রিপোর্ট থেকেই এই হিসাব সামনে এসেছে। কংগ্রেস ওই ভোটপর্বে খরচ করেছে ২৪৮ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ওই সময়ে তাদের পাওয়া অনুদানের থেকেও নির্বাচনী ব্যয় বেশি। বিজেপির ক্ষেত্রে ছবিটা উল্টো। অসম, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে দলটির নির্বাচনী ব্যয় ছিল প্রায় ১৫৯ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে প্রায় ১৩০ কোটি ৪০ লক্ষ খরচ হয়েছে তারকা প্রচারকদের যাতায়াত-সহ সাধারণ প্রচারে। শুধু অসমেই খরচ প্রায় ৯৬ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা।

 

পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব তখনও প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিজেপির মোট নির্বাচনী খরচ আরও বাড়বে। কিন্তু প্রকাশিত হিসাব বলছে, ভোটে বিপুল খরচের পরেও দলটির হাতে থাকা অর্থ ভোটের আগের তুলনায় বেড়েছে। অর্থাৎ খরচের থেকেও দ্রুত এসেছে অনুদান। এর মধ্যেই রাজনৈতিক অনুদান নিয়ে আরও একটি বড় অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস।

কংগ্রেস নেতা শক্তি সিং গোহিলের দাবি, দেশের নিবন্ধিত কিন্তু স্বীকৃতিহীন রাজনৈতিক দলগুলিকে ব্যবহার করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি ও কালো টাকার কারবার হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবিও করেছেন তিনি।

 

এই ১০ হাজার কোটি টাকা বিজেপির ১,৪৭৩ কোটি টাকার অনুদানের অংশ নয়। দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা হিসাব। ১০ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি কংগ্রেসের অভিযোগ, এখনও প্রমাণিত কেলেঙ্কারির অঙ্ক নয়।

গোহিলের অভিযোগে গুজরাতের ছ’টি ছোট রাজনৈতিক দলের কথাও এসেছে। গরিব কল্যাণ পার্টি, আম জনমত পার্টি, সত্যবাদী রক্ষক পার্টি, স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি এবং ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল—এই ছ’টি দলের কাছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা অনুদান আসার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

কংগ্রেসের দাবি, রাজনৈতিক দলকে অনুদানে আয়কর আইনের ৮০জিজিবি এবং ৮০জিজিসি ধারায় করছাড়ের সুযোগকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা সংস্থা রাজনৈতিক দলকে অনুদান দেখিয়ে করছাড় নিচ্ছে, তার পরে কমিশন কেটে বাকি টাকা নগদে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগেরই তদন্ত চেয়েছে কংগ্রেস।

দেশে নিবন্ধিত কিন্তু স্বীকৃতিহীন রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় ৩,২৬০ বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এত ছোট দলের কাছে বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসছে, সেই প্রশ্নও উঠছে।

একদিকে পাঁচ রাজ্যের ভোটের ৫৩ দিনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দপ্তরে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। কংগ্রেসের কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়েও তার সাত ভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। অন্যদিকে ছ’টি ছোট দলের কাছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা এবং ১০ হাজার কোটি টাকার কথিত কারবারের অভিযোগ।

 

তাহলে ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্রমশ কাদের অর্থের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে? কয়েক সপ্তাহে একটি রাজনৈতিক দলের কাছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কারা দিলেন? বিপুল অনুদান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে কি না, তা জানার সুযোগ ভোটারের কতটা রয়েছে? আর হাজার হাজার কোটি টাকা যখন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ঘুরছে, সেই অর্থের উৎস ও শেষ গন্তব্য প্রকাশ্যে আনার দায়িত্ব কার? এমন নানা প্রশ্নই তুলছেন রাজনৈতিক মহল।

তথ্যসূত্র: ভারতের নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কনসলিডেটেড এক্সপেনডিচার রিপোর্ট, ২০২৬; অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস; শক্তি সিং গোহিলের বক্তব্য, সেপ্টেম্বর ২০২৬; রাজনৈতিক অনুদান সংক্রান্ত আয়কর আইনের ৮০জিজিবি ও ৮০জিজিসি ধারা।