রাজ্য রাজনীতিতে ফের একবার উত্তাপ বাড়িয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত নতুন বিল। সম্প্রতি বিধানসভায় পেশ হতে চলা একটি সংশোধনী বিল এবং রাজনৈতিক দলগুলির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় দখলের লড়াই নয়, বরং রাজ্যজুড়ে মতাদর্শগত ও ক্ষমতার সমীকরণের এক গভীর রূপরেখা ফুটিয়ে তুলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শুভেন্দু অধিকারীর একটি গেরুয়া সম্মান যাত্রাকে কেন্দ্র করে। গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত এই মিছিলে আরএসএস এবং বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-কে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মিছিলের সমাপ্তি ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী তথা শাসকপক্ষের নেতার মন্তব্য—”এখানে সব গেরুয়া হবেই হবে”—রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, অতীতে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ফাঁকা আওয়াজ তোলার যে প্রবণতা দেখা গেছে, বর্তমান পদক্ষেপগুলিও সেই একই রাজনৈতিক কৌশল বা আইওয়াশ মাত্র।
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় পেশ হতে চলা ‘দ্য ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’ এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই বিলের আড়ালে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে বেছে বেছে বিরোধী বা ভিন্নমতের অধ্যাপক ও কর্মচারীদের অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে সেখানে গেরুয়া পন্থী বা আরএসএস ঘেঁষা ব্যক্তিদের পুনর্বাসিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা চলছে। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে তাকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনার এই প্রচেষ্টাকে শিক্ষা জগতের স্বাধীনতা হরণের সামিল বলে মনে করছেন অনেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ বা অন্যান্য রাজনৈতিক স্লোগানকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা কঠোরহস্তে দমনের যে হুঙ্কার শাসকপক্ষ দিয়েছে, তা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বেদপাঠ ও হনুমান চালিসা পাঠের মতো কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসছে, প্রশ্ন জাগে এর মধ্য দিয়ে কি আসলে শিক্ষার পরিবেশের পরিবর্তে রাজনৈতিক মেরুকরণকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে?
সবমিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার অঙ্গন এক তীব্র মতাদর্শগত লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। একদিকে রাজ্যের শাসকপক্ষের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ও বামপন্থী প্রভাবপুষ্ট শিক্ষাঙ্গনকে রক্ষা করার তাগিদ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।