চন্দন দাস
সেখ সামাদের এতিমখানায় তৈরি হয়েছিল ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি।’ ২০০৭-এর ৫ই জানুয়ারি। কমিটির পতাকার রঙও ঠিক হয়েছিল আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে— কালো।
নন্দীগ্রাম-১নং ব্লক অফিসের কাছেই সামাদের সেই এতিমখানা। সামাদ ঘোরতর তৃণমূল সমর্থক ছিলেন। তাঁর এতিমখানাতেই নন্দীগ্রামে তৎকালীন সরকারের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কমিটির পাশাপাশি পতাকার রঙও ঠিক হয়েছিল। আন্দোলনকে নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলের বলে যাতে চিহ্নিত করা না যায়, সেই ক্যামোফ্লেজের জন্য ‘শোকের রং’ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
তারপর প্রায় ১১মাস সেই কালো রঙের পতাকাই দেখা গেছে আন্দোলনকারীদের মিছিলে, সভায়। তৃণমূল, জামাতে উলেমা হিন্দ, বিজেপি, কংগ্রেস, এসইউসি, মাওবাদী— এমন নানা দল সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিল। ১১ মাস নন্দীগ্রাম অবরুদ্ধ ছিল। ২০০৭-এর ১১ই ফেব্রুয়ারি খেজুরির হেঁড়িয়াতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, নন্দীগ্রামে এক ছটাক জমিও নেবে না সরকার। তারপরও অবরোধ চলেছিল। ভাঙা হয়েছিল ব্রিজ, কালভার্ট সহ অনেকগুলি সরকারি সম্পত্তি। নন্দীগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বামপন্থী কর্মীরা ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া হয়েছিলেন। শুভেন্দু অধিকারী তখন ছিলেন ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র সর্বেসর্বা। মনে আছে, ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে চন্ডীপুর থেকে নন্দীগ্রামে প্রবেশ পথের পাশে সাদা দেওয়ালে কালো দিয়ে লেখা হয়েছিল— ‘আপনারা সিপিএম শূন্য এলাকায় প্রবেশ করছেন।’
‘কালো’, যা রাজনীতিতে ছিল শোক আর কখনও কখনও প্রতিবাদের রঙ, মাওবাদী-তৃণমূল কংগ্রেসের সশস্ত্র দখলের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে সেই কালো পতাকা আর দেখা যায়নি। কারন— নন্দীগ্রামের সেই আন্দোলনের যাবতীয় ফসল ঘরে তুলেছিল প্রধানত তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের কালো পতাকার আর কোনও দরকার ছিল না। নন্দীগ্রামে শুরু হয় ঘাস ফুলের রাজত্ব। সেখান থেকেই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘাস ফুল আঁকা পতাকার ছড়াছড়ি শুরু হয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ‘নীল সাদা’-কেই নিজের পরিচিতির রঙ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
পরের ১৫ বছরে ‘নীল সাদা’ লুট, তোলাবাজি, কাটমানি, সন্ত্রাসের চিহ্ন হিসাবে পরিচিত হয়েছে। ‘নীল সাদা’ তৃণমূল কংগ্রেসের দুরাত্মাদের একাধিপত্যের চিহ্নে পরিণত হয়েছিল। সেই রঙ সম্পর্কে রাজ্যের মানুষের মধ্যে এক ঘৃণা তৈরি হয়েছে। আজ রাজ্যে ঘাস ফুল আঁকা তিন রঙের পতাকাও বিশেষ চোখে পড়ে না। নীল সাদা বিবর্ণ, ব্রাত্য।
বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জিতেছে। বিজেপি ২০৮টি আসনে জিতেছে। এই বিপুল জয়লাভের পর রাজ্যের সর্বত্র বিজেপি’র পতাকারই একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা। কিন্তু ‘সবুজ আর গেরুয়ার মাঝে আঁকা পদ্ম’, বিজেপি’র সেই পতাকার বদলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে গেরুয়া রঙ, ঝান্ডাকে। প্রধান উদ্যোক্তা সেই মানুষটি, যিনি নন্দীগ্রামে কালো পতাকা হাজির করেছিলেন প্রায় কুড়ি বছর আগে। যিনি ছিলেন ‘নীল সাদা’ সাম্রাজ্যের অন্যতম কারিগর। আজ ‘গেরুয়া’কে নিয়ে তোড়জোরও তাঁরই। তিনি শুভেন্দু অধিকারী। সেদিন ছিলেন বিধায়ক। আজ মুখ্যমন্ত্রী।
কেন শুভেন্দু অধিকারী এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন?
স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া রঙ কিংবা পতাকা নিয়ে কোনও সংগঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউ কখনও কটুক্তি করেননি। মন্দিরের মাথায় উড়েছে গেরুয়া ঝান্ডা। কারও কোনও আপত্তি ওঠেনি। সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রে ‘গেরুয়া তান্ডব’ শিরোনাম হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সভা করতে চলে গেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। সাধু, সন্ন্যাসীদের নিয়ে গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত মিছিলের সামনে কে? শুভেন্দু অধিকারী। মিছিলের নাম দেওয়া হলো— ‘গেরুয়া সন্মান যাত্রা।’ একটি সংবাদপত্রের শিরোনামের প্রতি আপত্তি জানাতে যাদবপুরে মিছিলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বোধগম্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থীরা শক্তিশালী। সেখানে সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠনকে জেতাতে চান মুখ্যমন্ত্রী। তাই বলে গেরুয়াকে ব্যবহার করে?
প্রশ্ন আরও আছে। গেরুয়ার ‘সন্মান’ রক্ষার লোক কী রাজ্যে কম পড়েছে? শুধু সাধুরা কী যথেষ্ট নন এমন মিছিল করার জন্য? ‘গেরুয়ার সন্মান’ রক্ষার আহ্বান জানানো মিছিলের কেন সরকারি সহায়তা, এত নিরাপত্তার প্রয়োজন পড়বে? দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিন্হা’র মতো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে কৈশোর থেকে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা কী গেরুয়া-প্রেমী নন? তাঁরা এই ধরনের মিছিলে, সভায় থাকছেন না কেন? বিজেপি’র সমর্থকদের অন্দরে এই প্রশ্ন উঠছে।
প্রসঙ্গত, গেরুয়া বা ফাগোয়া ঝান্ডাকে নিজের দল হিন্দু মহাসভার পতাকা করেছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ(আরএসএস) তৈরি হয়। তাদের পতাকার রঙও গেরুয়া। ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার দিন হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ত্রিবর্ণ পতাকার বদলে বাড়িতে বাড়িতে গেরুয়া ঝান্ডা তোলার আহ্বান জানিয়েছিল। অবশ্য পরে আরএসএস-ও ত্রিবর্ণ পতাকাকে জাতীয় পতাকা হিসাবে মেনে নেয়।গেরুয়াকে কেন্দ্র করে শুভেন্দু অধিকারী কী চাইছেন? তাঁরই উদ্যোগে বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেস দু’ভাগ হয়েছে।
বিধানসভায় বিরোধী বলতে শুধুই একজন সিপিআই(এম) এবং একজন আইএসএফ বিধায়ক। বিজেপি, বিশেষত সঙ্ঘ ইতিমধ্যেই বামপন্থীদের প্রধান শত্রু হিসাবে নির্ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে, দল এবং কেন্দ্রীয় সরকারে নিজের কদর আরও বাড়াতেই ‘গেরুয়ার সন্মান’ প্রসঙ্গে এতটা সক্রিয় হয়েছেন অধিকারী। আর তা করতে গেলে বামপন্থীদের গেরুয়া-বিরোধী বলে দেগে না দিলে রাজনীতির পথ মসৃণ হচ্ছে না।
তালপাটি খালের ধারে যে কৌশলে নিশানের রঙ কালো ছিল, আজ সেই কাজেই গেরুয়ার ব্যবহার হচ্ছে। বিবেকানন্দর পোষাকের রঙের কী সন্মান বাড়ছে?