প্রধান বিচারপতির আসন থেকে রাষ্ট্রের প্রধান : মুহাম্মদ হিদায়াতুল্লাহর বর্ণময় জীবন

মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী   প্রখ্যাত আইনজীবী,সমাজসেবী, বিচারপতি,রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, ভাষাবিদ, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্টপতি ১৯০৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের বেতুলে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের একাদশ প্রধান বিচারপতি। ভারতের আইনি ইতিহাসে বহু গ্ৰন্থের জনক।....

মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী

 

প্রখ্যাত আইনজীবী,সমাজসেবী,
বিচারপতি,রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, ভাষাবিদ, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্টপতি
১৯০৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের বেতুলে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের একাদশ প্রধান বিচারপতি। ভারতের আইনি ইতিহাসে বহু গ্ৰন্থের জনক। তিনি স্বাধীন ভারতে একমাত্র ভারতীয় নাগরিক যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির পদ অলঙ্কৃত করেছেন।

 

বিশিষ্ট উর্দু কবি, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ খানবাহাদুর হাফিজ মুহাম্মদ বিলায়েতুল্লাহ-তার পিতা , মাতা সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সদস্যা মহাম্মদী বেগ।
একমাত্র পুত্র আরশাদ হিদায়াতুল্লাহ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবি হিসেবে কর্মরত।পত্নী পুষ্প শাহ জৈন পরিবারের কন্যা।
ফিলিপস স্কলার হিসেবে তিনি নাগপুরের মরিস কলেজ থেকে ইংরেজি, ইতিহাস ও ফারসিতে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে শিক্ষাগত উৎকর্ষতার জন্য স্নাতক সম্পন্ন করলে তাঁকে মালাক স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।
পিতার ইচ্ছানুসারে, ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজ থেকে ইংরেজি, ইংরেজি সাহিত্য ও আইনে বি.এ এবং এম.এ ডিগ্ৰি লাভ করেন। কেমব্রিজে স্বর্ণপদক বিজয় হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
১৯৩০ সালে ২৫ বছর বয়সে লিঙ্কন’স ইন-এ ব্যারিস্টার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

 

ভারতে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত হিদায়াতুল্লাহ তৎকালীন নাগপুর হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন । ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে তিনি উক্ত আদালতে সরকারি উকিল হিসেবে নিয়োগ হন, ১৯৪৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২ আগস্ট থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি মধ্য প্রদেশ ও বেরার হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন।
১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে হিদায়াতুল্লাহ নাগপুর বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২৪ জুন তিনি মধ্যপ্রদেশ ও বেরার হাইকোর্টে অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনি উক্ত আদালতের
স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োজিত হন। এই বছরেই রাজা ষষ্ঠ জর্জ বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহকে ‘অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

 

১৯৫৪ সালের ৩ ডিসেম্বর, বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ নাগপুর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন-যার ফলে তিনি তাঁর সময়ে হাইকোর্টের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হন। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ১ ডিসেম্বর, ৫২ বছর বয়সে, তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে সর্বকনিষ্ঠ বিচারপতি হন।
১৯৬৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ভারতের একাদশ প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তিনি ভারতের প্রথম মুসলিম প্রধান বিচারপতিও হন। মাধব রাও সিন্ধিয়া বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মাম যুগান্তকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় প্রদানের পর ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রধান

 

বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যকাল-১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতির পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৩ মে, তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন পরলোকগমন করলে, উপরাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ভি ভি গিরি উভয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। উভয় পদ শূন্য হওয়ায় বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহকে ভারতের ভারপ্রাপ্ত রাষ্টপতি পদে উন্নীত করা হয়।১৯৭০ সালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণের প্রায় এক দশক পর, পূর্ব জনতা সরকারের বিলুপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে, বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ ১৯৭৯ সালের ৩১ আগস্ট ভারতের ষষ্ঠ উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের ৩০ আগস্ট পদত্যাগ করে পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করেন।

 

প্রকাশ থাকে যে, উপরাষ্ট্রপতিদের ক্ষেত্রে যেমনটা প্রায়শই হয়ে থাকে, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে উন্নীত করা হয়নি, কারণ তাঁকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের একজন সমালোচক হিসেবে দেখা হতো।
১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি জৈয়েল সিং হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিলে বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ ৬ অক্টোবর ১৯৮২ সাল থেকে ৩১ অক্টোবর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত পুনরায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ ইংরেজি, উর্দু, ফরাসি এবং হিন্দি ভাষায় একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি জীবদ্দশায় একাধিক সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন।

 

বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ তাঁর বিচারিক কর্মজীবনের পাশাপাশি ভারতের আইন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গেও সংযুক্ত ছিলেন। তিনি নাগপুরের ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ ল-তে আইনশাস্ত্র ও মুসলিম আইনের প্রভাষক ছিলেন (১৯৩৫-৪৩), নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন হন (১৯৪৯-৫৩)। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে তিনি কোর্ট বিক্রম বিশ্ববিদ্যালয়, সাগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সদস্য ছিলেন। নাগপুর হাইকোর্টে অনুশীলন করার সময় তিনি নাগপুর পৌর কমিটি (১৯৩১-৩৩), আইনশাস্ত্র ও মুসলিম আইন বিষয়ের প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ ল, নাগপুর(১৯৩৫- ১৯৪৩),

 

নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী ও একাডেমিক কাউন্সিল(১৯৩৪ – ১৯৫৩)।
নাগপুর ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের (১৯৪৩-৪৫) সদস্যও ছিলেন।
১৯৬৮ সালে বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ ইনস অফ কোর্ট সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ইন্টারন্যাশ ল’ অ্যাসোসিয়েশন (১৯৬৮-৭০), ইন্ডিয়ান ল’ ইনস্টিটিউট (১৯৬৯-৭০),ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ইন্টারন্যাশনাল ল (১৯৬৯-৭০)-এর সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 

সুপ্রিম কোর্টে থাকাকালীন (১৯৫৮-৭০), বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ ৪৬১টি রায় রচনা করেন এবং ১,২২০টি বেঞ্চে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ৪৯টি রায় দেন।
সুপ্রিম কোর্টের উল্লেখযোগ্য রায়–
(১)গোলকনাথ বনাম পাঞ্জাব রাজ্য (১৯৬৭)
(২)সজ্জন সিং বনাম রাজস্থান রাজ্য (১৯৬৪) মামলায় মৌলিক অধিকারের অ-সংশোধনযোগ্যতার পক্ষে বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ-র ভিন্নমতকে ১৯৬৭ সালের গোলকনাথ রায়ের ভিত্তিপ্রস্তর বলা যেতে পারে। এখানেও, বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ জোরালোভাবে ঘোষণা করেন যে, ব্যক্তির স্বাধীনতা মৌলিক। ব্যক্তির স্বাধীনতার এই মৌলিক দিকটি পরিবর্তন করা সংসদের দ্বারা সাংবিধানিক কার্যাবলীর জবরদখল।

 

(৩) নরেশ এস. মিরাজকর বনাম পাঞ্জাব রাজ্য, (১৯৬৬)
অন্তত দুইবার বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ নিজের ভুল স্বীকার করে এবং সেই অনুযায়ী নিজের মতামত পরিবর্তন করে রায়ের সাথে সংক্ষিপ্ত মতামত যোগ করেছেন। নরেশ এস. মিরা বনাম পাঞ্জাব রাজ্য মামলায়, আদালত
ব্লিটজ পত্রিকার বিরুদ্ধে একজন ব্যবসায়ীর দায়ের করা একটি মানহানির মামলার বিচার করছিল। ৯-সদস্যের বেঞ্চে বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ-ই ছিলেন একমাত্র ভিন্নমত পোষণকারী। তিনি বলেন যে, সংবিধানের রক্ষক হিসেবে বিচারপতিদের ভুল করার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম হলেও, বিশেষ করে মৌলিক অধিকারের প্রেক্ষাপটে, তাদের সংবিধান লঙ্ঘনের সম্ভাবনা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

 

(৪) রঞ্জিত উদেশী বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য, (1964)
বিতর্কিত উপন্যাস ‘লেডি চ্যাটারলে’স লাভার’ অশ্লীল কি না, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন যে, যেখানে অশ্লীলতা ও শিল্প মিশ্রিত হয়, সেখানে শিল্পকেই অশ্লীলতাকে আড়ালে ঠেলে দিতে হবে। তবে, বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে তাঁর এই অবস্থান অবাধ ছিল না। রায়ে তিনি এই অধিকারের এমন যেকোনো প্রয়োগকে নাকচ করে দেন, যা জননৈতিক শালীনতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, যা ফলস্বরূপ পরবর্তীকালে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।

 

(৫) মাধব রাও সিন্ধিয়া বনাম ভারত সরকার, (১৯৭০)
প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর সর্বশেষ মামলায় বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহ সহমত পোষণকারী রায় দেন, যেখানে তিনি রায় দেন যে, দেশীয় রাজ্যগুলির শাসকদের প্রাপ্ত ‘প্রিভি পার্স’ বা রাজভাতা বিলোপ করা সংবিধানের ক্ষমতার পরিপন্থী। তিনি মত দেন যে, রাজভাতা হলো সম্পত্তি এবং শুধুমাত্র একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা কেড়ে নেওয়া যায় না। উল্লেখ্য যে, এই মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহকে লোকপাল দুর্নীতি দমন কমিটি এবং বিশ্ব আদালতের (যা প্রায়শই আন্তর্জাতিক বিচার আদালত নামে পরিচিত) জন্য বিবেচনা করা হচ্ছিল। তিনি এই পদগুলি প্রত্যাখ্যান করার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর সহমত পোষণকারী রায় প্রদান করেন।

 

১৯৯২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মুম্বাইতে (তৎকালীন বোম্বে) মহান শিক্ষাব্রতী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে হিদায়াতুল্লাহ জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয় (HNLU) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।