সফদার হাসমীর ‘চক্কা জাম’ থেকে ‘হল্লা বোল’: ঝড় তুলেছিল দিল্লিতে

ড. রতন ভট্টাচার্য   তখন দিল্লীতে কংগ্ৰেস সরকার। তখনও দিল্লির রাজপথ শুধু রাজনীতির মঞ্চ ছিল না, প্রতিবাদেরও এক দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে। সেই ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন মাইক্রোফোন....

ড. রতন ভট্টাচার্য

 

তখন দিল্লীতে কংগ্ৰেস সরকার। তখনও দিল্লির রাজপথ শুধু রাজনীতির মঞ্চ ছিল না, প্রতিবাদেরও এক দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে। সেই ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন মাইক্রোফোন ছাড়াই মানুষের কণ্ঠস্বর বহুদূর পৌঁছে গিয়েছে। ব্যানার ছাড়াই তৈরি হয়েছে জনমত। আর মঞ্চ ছাড়াই থিয়েটার হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের অস্ত্র। সফদার হাসমীর ‘চক্কা জাম’ থেকে ‘হল্লা বোল’-এর যাত্রা সেই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর অধ্যায়। এটি কেবল দুটি পথনাটকের নাম নয়; এটি ভারতীয় পথনাট্যের ভাষা বদলে দেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা।

 

 

সফদার হাসমী ১৯৭৩ সালে জন নাট্য মঞ্চ বা ‘জানাম’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। প্রথমদিকে দলটি প্রচলিত মঞ্চনাটক করলেও সত্তরের দশকের শেষভাগে তারা নাটককে প্রেক্ষাগৃহের চার দেওয়াল থেকে বের করে আনতে শুরু করে। শ্রমিক, নিম্নবিত্ত, সাধারণ পথচারী—যাঁদের অনেকেই নিয়মিত থিয়েটার দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যান না, তাঁদের কাছে নাটক পৌঁছে দেওয়াই হয়ে উঠল লক্ষ্য। ১৯৭৮ সালে ‘মেশিন’-এর মতো নাটক এই নতুন পথনাট্যধারাকে সুস্পষ্ট পরিচয় দেয়। পরবর্তী এক দশকে জানাম বহু সামাজিক ও শ্রমিক-জীবনকেন্দ্রিক পথনাটক তৈরি করে।

 

এই নাট্যচর্চার মধ্যে ‘চক্কা জাম’ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘চক্কা জাম’—শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শহরের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দেওয়ার প্রতীক। শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মঘট, সংগঠিত প্রতিবাদ এবং শ্রমজীবী মানুষের দাবি যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছিল, তখন জানাম সেই বাস্তবতাকে নাটকের ভাষায় ধরেছিল। নাটকটি কীভাবে পরবর্তী সময়ে রূপান্তরিত হয়ে ‘হল্লা বোল’-এ পৌঁছেছিল, সেই প্রক্রিয়া নাট্যকর্মী ও জানামের সদস্য সুদন্বা দেশপাণ্ডের স্মৃতিচর্চায় বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।’চক্কা জাম’ থেকে ‘হল্লা বোল’—এই রূপান্তর আসলে শুধু নাম পরিবর্তন নয়। এর মধ্যে ছিল সময়ের পরিবর্তন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং নাট্যভাষার আরও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠা। রাস্তার নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার তাৎক্ষণিকতা। কোনো ভারী সেট নেই, আলোর বিশেষ আয়োজন নেই, পর্দা নেই, নির্দিষ্ট আসন নেই। রাস্তার মাঝখানে কয়েকজন অভিনেতা দাঁড়ালেন, দর্শক চারপাশে বৃত্ত তৈরি করলেন, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শহরের একটি সাধারণ জায়গা হয়ে উঠল রাজনৈতিক-সামাজিক প্রশ্নের মঞ্চ।

 

 

এখানেই সফদার হাসমীর মৌলিকত্ব। তিনি থিয়েটারকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক অপেক্ষা করেন নাটকের জন্য; পথনাট্যে নাটক নিজেই দর্শকের কাছে যায়। ফলে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রায় বিলীন হয়ে যায়। সংলাপ শুধু শোনা হয় না, প্রতিক্রিয়াও তৈরি করে। পথচারী থেমে যান, শ্রমিক কাজের ফাঁকে দাঁড়িয়ে পড়েন, কৌতূহলী মানুষ ভিড় করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ছোট্ট অভিনয় হয়ে উঠতে পারে জনপরিসরের আলোচনার কেন্দ্র।সফদারের নাট্যচিন্তার পেছনে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

জরুরি অবস্থার অভিজ্ঞতা, ১৯৮৪-এর শিখবিরোধী হিংসা, শ্রমিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক—দিল্লির সাংস্কৃতিক পরিসরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময়ে মূলধারার থিয়েটারের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবাদের একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরি হচ্ছিল। সফদার এবং জানাম শ্রমিকদের নানা প্রশ্নকে নাটকে নিয়ে এসেছিলেন। এই ধারার নাটককে কেবল রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে দেখলে তার শিল্পগত গুরুত্বকে ছোট করা হয়। পথনাটকের নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করেছিলেন সফদাররা—ছন্দ, সমবেত উচ্চারণ, শরীরী অভিনয়, সরল অথচ তীক্ষ্ণ সংলাপ, গান, ব্যঙ্গ এবং দর্শকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। নাটক ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার সামাজিক অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।

 

 

‘চক্কা জাম’-এর মধ্যেই তাই ‘হল্লা বোল’-এর বীজ ছিল। আর ‘হল্লা বোল’ শুধু একটি নাটকের নাম হয়ে থাকেনি; ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি সেটিই সফদার হাসমীর জীবনের শেষ নাটক হয়ে উঠেছিল।সেদিন দিল্লির কাছে সাহিবাবাদ অঞ্চলের ঝান্ডাপুরে শ্রমিকদের মধ্যে ‘হল্লা বোল’ পরিবেশন করছিল জন নাট্য মঞ্চ। সেই সময় একদল হামলাকারী লাঠি ও লোহার রড নিয়ে নাট্যদলের উপর আক্রমণ করে। সফদার গুরুতর আহত হন। স্থানীয় শ্রমিক রাম বাহাদুরও নিহত হন। পরদিন, ২ জানুয়ারি ১৯৮৯, সফদার হাসমী মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৪ বছর। ঘটনাটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক জগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়।হামলার ফলে নাটক থেমে গেলেও নাট্যকর্মীরা থেমে থাকেননি।

 

 

৪ জানুয়ারি জানামের সদস্যরা আবার সেই জায়গায় ফিরে যান এবং ‘হল্লা বোল’ সম্পূর্ণ করেন। সফদারের স্ত্রী ও সহকর্মী মোলয়শ্রী হাসমীও সেই পুনঃঅভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ যে নাটকটি হামলার কারণে অসম্পূর্ণ হয়েছিল, সেটিই কয়েক দিনের মধ্যে আবার মানুষের সামনে সম্পূররা হলো। এই ঘটনাটি ভারতীয় পথনাট্যের ইতিহাসে এক অসাধারণ প্রতীক হয়ে আছে। সফদারের মৃত্যু তাই তাঁর নাটকের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। বরং তাঁর মৃত্যুর পর ‘হল্লা বোল’ আরও বড় অর্থ অর্জন করে। এটি হয়ে ওঠে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ এবং শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার একটি প্রতীক। সফদারের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে সাহমত বা Safdar Hashmi Memorial Trust, যা শিল্প, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নানা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত  হয়েছে।
সফদারের মৃত্যুর পর তাঁর সহকর্মীরা শুধু স্মরণসভা করেননি; তাঁরা তাঁর অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই জায়গাতেই সফদার হাসমীর উত্তরাধিকার অন্যরকম। একজন শিল্পীর মৃত্যু কখনও কখনও তাঁর শিল্পকে আরও বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে নিয়ে যায়। তাঁর নাম হয়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক স্মারক, তাঁর নাটক হয়ে ওঠে একটি ঐতিহাসিক দলিল।

 

 

আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে ‘চক্কা জাম’ বা ‘হল্লা বোল’-এর দিকে তাকালে সময়ের ব্যবধান স্পষ্ট। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে একটি বক্তব্য লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ভিডিও ভাইরাল হতে পারে, প্রতিবাদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত হতে পারে। কিন্তু সরাসরি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নাটক করার যে শারীরিক ও মানবিক অভিঘাত, তা এখনও আলাদা।পথনাট্যের দর্শক শুধু দর্শক নন। তিনি একই রাস্তার মানুষ। অভিনেতার কণ্ঠ তাঁর কানে পৌঁছয় কোনো বৈদ্যুতিন মাধ্যমের মধ্যস্থতা ছাড়াই। চারপাশের পরিবেশও নাটকের অংশ হয়ে ওঠে। একটি কারখানার সামনে শ্রমিকদের জন্য করা নাটক আর প্রেক্ষাগৃহে একই নাটক করার মধ্যে তাই মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।সফদার হাসমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই—শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। শিল্পী কি শুধু সৌন্দর্যের সন্ধান করবেন, না কি সমাজের অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেও সামনে আনবেন? থিয়েটার কি কেবল বিনোদন, না কি প্রশ্ন তোলার মাধ্যমও? সফদারের কাজ এই প্রশ্নগুলির সরল উত্তর না দিলেও একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
তাঁর পথনাট্য অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। ভারতীয় থিয়েটারে তিনি দেখিয়েছিলেন, বড় মঞ্চের প্রয়োজন নেই—প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইচ্ছা। নাটককে মানুষের জীবনের কাছাকাছি আনলে রাস্তার একটি মোড়ও মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

 

 

‘চক্কা জাম’ থেকে ‘হল্লা বোল’—এই যাত্রা তাই দিল্লির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে শুধু একটি নাট্যদলের কাহিনি নয়। এটি এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, শ্রমজীবী মানুষের প্রশ্ন, প্রতিবাদের ভাষা এবং শিল্পীর সামাজিক ভূমিকার ইতিহাস। ১৯৮৯-এর সেই রক্তাক্ত দিন নাটককে থামাতে পারেনি। বরং ‘হল্লা বোল’ শব্দবন্ধটি তার পর থেকে আরও গভীর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কংগ্ৰেসী স্বৈরতন্ত্ৰের বিরুদ্ধে দিল্লির রাজপথে সেই ঝড় আজ অতীত। সফদার হাসমীও নেই। কিন্তু পথনাট্যের ইতিহাসে তাঁর পদচিহ্ন মুছে যায়নি। কারণ তিনি দেখিয়ে গিয়েছিলেন—মঞ্চের উচ্চতা নয়, মানুষের কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতাই থিয়েটারের আসল শক্তি। আর কখনও কখনও একটি ছোট্ট রাস্তার নাটকই হয়ে উঠতে পারে একটি সময়ের আয়না, একটি সমাজের প্রশ্ন এবং ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।

 

 

‘চক্কা জাম’ সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; ‘হল্লা বোল’ তার সবচেয়ে তীব্র প্রতিধ্বনি। দিল্লির রাজপথে একসময় যে কণ্ঠস্বর ঝড় তুলেছিল, সেই কণ্ঠস্বর আজও ভারতীয় পথনাট্যের ইতিহাসে শোনা যায়—প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে নয় শুধু, মানুষের কাছে শিল্পকে ফিরিয়ে দেওয়ার এক সাহসী প্রয়াস হিসেবে।

আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।