২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবসে ভ্রমণ বিষয়ক লেখা ও ভাবনা :
ভ্রমণ মানুষকে সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে শেখায়- মুফতি ওমর বিন নাছির :
মানুষ স্বভাবতই ভ্রমণপ্রিয়। অচেনা কোনো শহর, দূর পাহাড়, বিস্তীর্ণ সমুদ্র, সবুজ অরণ্য কিংবা প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মানুষকে আকর্ষণ করে।
ভ্রমণ মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে শেখায়:
একজন মানুষ যখন নিজের পরিচিত পরিবেশের বাইরে বের হয়, তখন সে পৃথিবীর বৈচিত্র্য নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
কোথাও তুষারাবৃত পাহাড়, কোথাও মরুভূমি, কোথাও সবুজ অরণ্য, কোথাও বিশাল সমুদ্র—প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য একই স্রষ্টার অসীম সৃজনশক্তির পরিচয় বহন করে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২২) ।
জ্ঞান অর্জনের জন্য ভ্রমণের গুরুত্ব ও ঐতিহ্য :
ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে সফর ও জ্ঞানচর্চার মধ্যে ছিল গভীর সম্পর্ক। হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও অন্যান্য জ্ঞান অর্জনের জন্য মুসলিম আলেমরা এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করেছেন। তাঁরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শায়খদের কাছে গিয়েছেন, হাদিস শুনেছেন, জ্ঞান যাচাই করেছেন এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের জন্য কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯) ।
ভ্রমণ মানুষের একঘেয়েমি দূর করে, নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। আর তাই আধুনিক বিশ্বে পর্যটন অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, তিনি কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর আল্লাহই পরবর্তী সৃষ্টি সৃষ্টি করবেন।
নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২০)
লক্ষ করার বিষয় হলো, আয়াতে শুধু ‘ভ্রমণ’ করতে বলা হয়নি; বলা হয়েছে—‘ভ্রমণ করো এবং দেখো’। অর্থাৎ ইসলামের ভ্রমণচেতনায় পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড় দেখে স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করা, সমুদ্র দেখে তাঁর অসীম ক্ষমতা স্মরণ করা, আকাশের বিশালতা দেখে নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব করা কিংবা কোনো প্রাচীন জনপদের ধ্বংসাবশেষ দেখে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করা—এসবই একজন মুমিনের ভ্রমণকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
কোরআনে বিভিন্ন জাতির পরিণতি উল্লেখ করার পর মানুষকে পৃথিবীতে বিচরণ করে তাদের পরিণতি দেখার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না, যাতে দেখতে পারে তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল?’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৯)
একটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ মনে করিয়ে দিতে পারে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কোনো বিশাল প্রাসাদ শেখাতে পারে—দুনিয়ার ঐশ্বর্য একদিন মানুষের হাতছাড়া হয়। আবার কোনো ঐতিহাসিক মসজিদ বা ইসলামী স্থাপত্য মুসলিমদের জ্ঞান, শিল্প, স্থাপত্য ও সভ্যতার অতীত অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
পর্যটন হোক প্রকৃতি পরিবেশের রক্ষা করে :
ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে শিক্ষা দিয়েছে। পর্যটনের নামে প্রকৃতি ধ্বংস, নদী-সমুদ্র দূষণ, পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নষ্ট করা কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল ভ্রমণ নয়। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীকে সংশোধনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।’(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬) ।
ভ্রমণের সময় ইবাদত:
ইসলামে সফরের জন্য আলাদা কিছু বিধান রয়েছে। সফররত ব্যক্তির জন্য নামাজে কসর করার বিধান রয়েছে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শরিয়ত তাকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের বাস্তব জীবন ও ভ্রমণের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেনি। তবে ভ্রমণের আনন্দ যেন নামাজ, পর্দা, হালাল-হারাম ও অন্যান্য শরিয়তি বিধান পালনের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। একজন মুমিনের জন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র যতই আকর্ষণীয় হোক, আল্লাহর ফরজ বিধানের চেয়ে তা কখনো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।