ফ্রান্সের অশান্তি: মুসলিমবিদ্বেষের রাজনীতি এবং এআইয়ের মিথ্যা প্রচার

ড.নুরুল ইসলাম বাবুল ফ্রান্সের রাজপথে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট—এই দৃশ্যগুলির কিছু বাস্তব, কিছু আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দুইয়ের মাঝখানে যে তৃতীয় বিষয়টি জায়গা....

ড.নুরুল ইসলাম বাবুল

ফ্রান্সের রাজপথে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট—এই দৃশ্যগুলির কিছু বাস্তব, কিছু আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দুইয়ের মাঝখানে যে তৃতীয় বিষয়টি জায়গা করে নিয়েছে, তা আরও উদ্বেগজনক: বাস্তব ঘটনাকে ব্যবহার করে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তার পরেই ঘটনাটির ব্যাখ্যা নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করেন; ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পরিস্থিতিকে ‘উগ্র ইসলামি আগ্রাসন’ বলে বর্ণনা করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ২১ অক্টোবর দোহায় এই ধরনের মন্তব্যের সমালোচনা করে জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি এমন ছবিও ছড়িয়েছে, যেখানে এমন সব ঘটনা দেখানো হয়েছে, যা ফ্রান্সে আদৌ ঘটেনি। এখানেই প্রশ্নটি জরুরি, আসলে ফ্রান্সের অশান্তির দায় নির্ধারণের আগে কি তার প্রকৃত কারণগুলি খতিয়ে দেখা হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক পূর্বধারণাই বাস্তবের জায়গা দখল করছে?

ফরাসি সংবাদপত্র Le Monde-এর ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন বলছে, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৮ লক্ষ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অর্থাৎ, আন্দোলনের প্রকাশ্য প্রেক্ষাপট ছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা। কোথাও সহিংসতা ঘটেছে বলে সেই আন্দোলনের প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে অপরাধী বলা যায় না; একইভাবে, কোনও অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে গোটা সম্প্রদায়ের দায় নির্ধারণও যুক্তিসংগত নয়। এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিমদের ক্ষেত্রে। কারণ, ইউরোপের অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে মুসলিম পরিচয়কে প্রায়ই নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মুসলিমরাই সংগঠিতভাবে সহিংসতা ঘটিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার ফারাক এখানেই। তাঁদের মন্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য; সেগুলি কোনও তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবে মুসলিমদের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে এটিও বলা যাবে না যে কোনও মুসলিম ব্যক্তি কখনও সহিংসতায় অংশ নেন না, কিংবা ইউরোপের প্রতিটি দাঙ্গার পেছনে মুসলিমবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র রয়েছে। অপরাধের দায় ব্যক্তির, প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু কয়েকজনের অপরাধকে একটি ধর্মের কোটি কোটি মানুষের পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ন্যায়বিচার নয়।

এআইয়ের তৈরি ছবি কীভাবে বিদ্বেষের অস্ত্র হয়ে উঠছে, তার প্রমাণও সামনে এসেছে। ব্রিটিশ তথ্য-যাচাই সংস্থা Full Fact ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে ফিলিস্তিনি পতাকা নিয়ে বিক্ষোভের একটি ছবি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। টাওয়ারের মাথায় ফিলিস্তিনি ও জর্ডানের পতাকা ওড়ানোর একটি ভিডিওও এআই-নির্মিত বলে শনাক্ত হয়। এমনকি বিক্ষোভের সময় এক বৃদ্ধ দম্পতিকে বিবস্ত্র করে লুট করা হয়েছে বলে প্রচারিত ছবিটির সত্যতারও কোনও সরকারি সমর্থন মেলেনি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের একটি পুরোনো ভিডিওকেও সাম্প্রতিক বিক্ষোভের দৃশ্য বলে চালানো হয়েছে। এগুলি নিছক প্রযুক্তিগত ভুল নয়। প্রতিটি ভুয়া ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা—অভিবাসীরা বিপজ্জনক, মুসলিমরা ফ্রান্স দখল করছে, ইউরোপের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ছবিটি যখন হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছায়, তখন অনেকেই তার উৎস যাচাই না করেই সেই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। বাস্তবের একটি সহিংস দৃশ্যের সঙ্গে এআই-নির্মিত কয়েকটি দৃশ্য মিশিয়ে দিলে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। ইউরোপের ডিজিটাল পরিসর নিয়ে কাজ করা সংস্থা Alliance4Europe-এর ২২ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণেও এই প্রবণতার উল্লেখ রয়েছে। সংস্থাটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের ৫ লক্ষ ৪৭ হাজারেরও বেশি পোস্ট এবং জনপ্রিয় ভিডিওর নিচে ১২ হাজারেরও বেশি মন্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। তাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, বিক্ষোভের উৎপত্তির পেছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি; কিন্তু বিক্ষোভের আগে ও পরে বিভিন্ন পক্ষ বাস্তব অসন্তোষকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। ইংরেজি ভাষার পোস্টে অভিবাসী ও ইসলামকে সরাসরি দায়ী করার প্রবণতা ফরাসি ভাষার পোস্টের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সংস্থাটির বিশ্লেষণে রাশিয়াসংশ্লিষ্ট একটি সমন্বিত প্রচার-নেটওয়ার্কের কথাও উঠে এসেছে। এই তথ্যের তাৎপর্য গভীর। ফ্রান্সের মানুষ কেন ক্ষুব্ধ, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের একটি অংশ যখন অভিবাসন ও ধর্মকে কেন্দ্র করে ব্যাখ্যা তৈরি করে, তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং সরকারের নীতির মতো বিষয়গুলি আড়ালে চলে যায়। তবে এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন: অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ থাকলেই প্রতিটি প্রচারাভিযানের পেছনে আমেরিকা বা ইজরায়েল সরকার রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনও রাষ্ট্রকে গুজবের সংগঠক বলা একই ধরনের দায়িত্বহীনতা হবে, যার সমালোচনা আমরা করছি।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও তাই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া দরকার। তাঁরা কেন ফ্রান্সের ঘটনাকে অভিবাসন ও ইসলামি উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করছেন, তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা খোঁজা যায়। নির্বাচনী রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধিতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন ভোটারদের প্রভাবিত করে—এটি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমানকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে হাজির করা উচিত নয়। বরং তাঁদের বক্তব্যকে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে। মাক্রোঁর সমালোচনাও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ: বিদেশি নেতারা যেন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সংকটকে নিজেদের নির্বাচনী প্রচারের উপকরণ না করেন। ফ্রান্সের মুসলিম নাগরিকদের অবস্থানও এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত। তাঁরা কেবল অভিবাসননীতি নিয়ে আলোচনার বিষয় নন; তাঁরা ফরাসি সমাজের অংশ, নাগরিক, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী। তাঁদের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে; কিন্তু অন্যের অপরাধের দায় তাঁদের ওপর চাপানো যাবে না। একই সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদেরও সহিংসতা ও লুটপাটের স্পষ্ট বিরোধিতা করতে হবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দাবি এবং অপরাধের নিন্দা—দুটির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি দেশের আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্রে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নাগরিকের সমান অধিকারের পরীক্ষাও। পুলিশি ব্যবস্থা, সরকারি নীতি ও বিক্ষোভকারীদের আচরণ—সবকিছুর বিচার হওয়া উচিত তথ্যের ভিত্তিতে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা ভিডিওর ক্ষেত্রে উৎস, তারিখ, স্থান এবং স্বাধীন তথ্য-যাচাইয়ের ফল দেখা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মুসলিম বনাম অমুসলিমের নয়। প্রশ্নটি সত্য বনাম অপতথ্যের, নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের, এবং যুক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারের। ফ্রান্সের রাজপথে যে মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের দাবি শুনতে হবে; যারা সহিংসতা করেছেন, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করে কোনও সংকটের ব্যাখ্যা তৈরি করা হলে তা সমস্যার সমাধান করে না—বরং সমাজকে আরও বিভক্ত করে। ইউরোপের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই সহজ সত্যটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপর।