সাকী মাহবুব
সমাজের প্রকৃত প্রাণশক্তি নিহিত থাকে মানুষের উন্নত চরিত্র, মার্জিত আচরণ ও আত্মিক নৈতিকতার ভেতরে। আর এই নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের মূল চাবিকাঠি হলো শালীনতা।
শালীনতা হলো মানুষের চিন্তা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাষা ও সামগ্রিক জীবনাচারের সেই মার্জিত রূপ—যা সমাজকে কুরুচি, অবক্ষয় ও অরাজকতা থেকে সুরক্ষিত রাখে।
ইসলাম মানুষকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিনম্র, মার্জিত, রুচিশীল ও শালীন হওয়ার জোর তাগিদ দেয়।
কোরআনের নীতি
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে শিষ্টাচার ও শালীন জীবনাচরণের স্পষ্ট নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছেন। লোকমান হাকিম তাঁর প্রিয় সন্তানকে চরিত্র গঠনের যেসব মৌলিক উপদেশ দিয়েছিলেন, আল্লাহ–তাআলা তা চিরন্তন উপদেশ হিসেবে কোরআনে সংরক্ষণ করেছেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার পদচারণে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রাখো…।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮-১৯)
শালীনতা মানুষের মধ্যকার হিংস্র পাশবিকতা ও বেপরোয়া কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন সমাজে অশালীনতা, কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি কিংবা উগ্র বেশভূষার বিস্তার ঘটে, তখন মানুষের ভেতরের অপরাধপ্রবণতা ও কুপ্রবৃত্তিগুলো দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন মানুষ নীতিবিবর্জিত ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না।
একমাত্র আত্মিক শালীনতা ও সংযমের অনুশীলনের মাধ্যমেই এসব অবক্ষয় থেকে নিজেকে পূতপবিত্র রাখা সম্ভব।
লজ্জাহীনতা কী ক্ষতি করে
অশালীনতা ও লজ্জাহীনতা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নানাবিধ নৈতিক অপরাধের পথ সুগম করে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুস্থ আবহ বজায় রাখার লক্ষ্যে পবিত্র কোরআনে শালীনতা ও শালীন পোশাকের বিধান স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ করে নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তার স্বার্থে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না (উদ্দাম সাজসজ্জা প্রকাশ কোরো না)…।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৩৩)
এখানে ইসলাম শুধু ঘরের ভেতর আবদ্ধ থাকার কথা বলেনি; বরং সর্বপ্রকার প্রদর্শনকামী মানসিকতা ও কুরুচিপূর্ণ বেশভূষা পরিহার করে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও মার্জিত জীবনাচার বজায় রাখার দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
লজ্জা ইমানের সৌন্দর্যের উৎস
শালীনতার মূল ভিত্তি ও উৎস হলো লজ্জাশীলতা (হায়া)। লজ্জা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং শালীন আচরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
রাসুল (সা.) মানবচরিত্রের এই সূক্ষ্ম মানসিকতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘যখন তোমার মধ্য থেকে লজ্জাই চলে যাবে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৮৪)
লজ্জাশীলতার সুফল কোনো একক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের সামগ্রিক সত্তাকে কল্যাণময় করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা পুরোটাই কল্যাণ বয়ে আনে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৭)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘লজ্জাশীলতা হলো ইমানের অন্যতম একটি মৌলিক শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯)
মানুষের আচরণ ও কথাবার্তার সৌন্দর্য নির্ধারণে লজ্জার ভূমিকা তুলে ধরে নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘অশ্লীলতা কোনো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তা সেই বিষয়কে কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়; আর লজ্জাশীলতা কোনো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তা সেই বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৪)