বহরমপুরের বাবুলবোনা রেসিডেন্সি সমাধিক্ষেত্র: ইতিহাসের ধুলোয় চাপা এক আইরিশ রাজার কাহিনি!

বহরমপুরের ইতিহাস বুঝতে গেলে প্রথমে তাকাতে হয় পাশের মুর্শিদাবাদের দিকে। ১৭০৪ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার দেওয়ানি প্রশাসনের কেন্দ্র ঢাকার পরিবর্তে মকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। পরবর্তীকালে এই শহরই মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত....

বহরমপুরের ইতিহাস বুঝতে গেলে প্রথমে তাকাতে হয় পাশের মুর্শিদাবাদের দিকে। ১৭০৪ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার দেওয়ানি প্রশাসনের কেন্দ্র ঢাকার পরিবর্তে মকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। পরবর্তীকালে এই শহরই মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয় এবং ধীরে ধীরে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেই সময় ভাগীরথীর তীরবর্তী বহরমপুর ছিল রাজধানীর দক্ষিণে অবস্থিত একটি গ্রামাঞ্চল। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, এই অঞ্চলের একটি গ্রামের নাম ছিল সাতপুকুরিয়া ব্রহ্মপুর। কথিত আছে, গ্রামটিতে প্রায় ৭০০ ঘর ব্রাহ্মণ বসবাস করতেন। সেই ব্রহ্মপুর নাম থেকেই পরবর্তীকালে বহরমপুর নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে এই নামকরণের বিবরণকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে প্রচলিত জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা উচিত।

পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭) পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময় বহরমপুরের গুরুত্বও বাড়তে শুরু করে। ইংরেজরা এখানে সেনানিবাস স্থাপন করে এবং ধীরে ধীরে এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

১৭৫৭ সালের ২৫ জুন, পলাশির যুদ্ধের কয়েক দিন পর, রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদে প্রবেশের পথে ময়দাপুরে শিবির স্থাপন করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ময়দাপুর ও কাশিমবাজার অঞ্চলে ইউরোপীয় বণিকদের বাগানবাড়ি এবং বসবাসের ব্যবস্থা ছিল। ১৭৬৮ সালে কাশিমবাজার কুঠির অধ্যক্ষেরও এখানে কিছুদিন অবস্থানের কথা জানা যায়।

অন্যদিকে, বহরমপুর শহর ও তার আশপাশে গড়ে উঠেছিল নীলকুঠি, রেশম ব্যবসার কেন্দ্র এবং ইউরোপীয় বণিক ও কর্মচারীদের বসতবাড়ি। শহরের বিভিন্ন পুরোনো অট্টালিকা একসময় সাহেবদের কুঠি বা বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এসব ভবনের কয়েকটি প্রশাসনিক দপ্তর, কৃষি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস কিংবা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হয়।

নীলচাষের অবসান এবং রেশম ব্যবসার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ইউরোপীয় ব্যবসায়ী তাঁদের পুরোনো সম্পত্তি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্থাপত্য আজও বহরমপুরের ঔপনিবেশিক অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

এই ইতিহাসেরই এক বিশেষ অধ্যায় লুকিয়ে আছে শহরের বাবুলবোনা অঞ্চলে—একটি পুরোনো সমাধিক্ষেত্রে, যেখানে শায়িত রয়েছেন ব্রিটিশ আমলের সামরিক কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মচারী, ইউরোপীয় ব্যবসায়ী এবং এক ব্যতিক্রমী আইরিশ সেনানায়ক।

বহরমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্বদিকে এগিয়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের বাবুলবোনা রোডের দক্ষিণে এবং স্টেট সেরিকালচারের উত্তরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক সমাধিক্ষেত্র। এটি রেসিডেন্সি সেমেট্রি বা স্টেশন বুরিয়াল গ্রাউন্ড নামেও পরিচিত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে বহরমপুরে বসবাসকারী বহু ইউরোপীয় ব্যক্তি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী এবং সামরিক আধিকারিককে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

একসময় এই সমাধিক্ষেত্র দীর্ঘদিন জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোনো কবর, পাথরের ফলক এবং সমাধিসৌধগুলি ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। স্থানীয় বিবরণ অনুসারে, একসময় কবরের পাথর ও ফলক চুরি এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছিল।

পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সমাধিক্ষেত্রটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে তালিকাভুক্ত। সমাধিক্ষেত্রের চারপাশে প্রাচীর নির্মাণ করে এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই সমাধিক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন জেমস স্কিনার, ক্যাপ্টেন জন ফ্রেন্ড, ফ্রেডারিক গ্রিফিথস, মুর্শিদাবাদের দেওয়ানি আদালতের রেজিস্ট্রার ড্যানিয়েল লেকি, মিসেস ক্যারোলিন ব্রাউন, জন উইলসন, ক্যাপ্টেন ল্যাম্বাট, কর্নেল মিচেল, কলিন সেক্সপিয়ার এবং ক্যাপ্টেন পেমবারটনের মতো ব্যক্তিদের নাম পাওয়া যায় বলে স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই ব্যক্তিদের প্রত্যেকের নাম, পদবি এবং মৃত্যুসাল সমাধিফলক অথবা নির্ভরযোগ্য সমাধি-তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্যাপ্টেন জেমস স্কিনারের সঙ্গে একই নামের বিখ্যাত অশ্বারোহী সেনানায়ক জেমস স্কিনারের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত প্রাথমিক সূত্র ছাড়া চূড়ান্তভাবে বলা উচিত নয়।

স্থানীয় বিবরণে ক্যাপ্টেন স্কিনারের ১৭৭৩ সালের সমাধিটিকে এই সমাধিক্ষেত্রের প্রাচীনতম কবর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সমাধিস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলির অন্যতম হলেন জর্জ টমাস—একজন আইরিশ নাবিক, যিনি অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিজের সামরিক দক্ষতায় হরিয়ানার একটি অঞ্চলের স্বাধীন শাসক হয়ে উঠেছিলেন।

আর এই জর্জ টমাসের জীবনকাহিনি যেন ইতিহাসের কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়েও বিস্ময়কর।

১৭৫৬ সালে আয়ারল্যান্ডের টিপারারি অঞ্চলের রস্ক্রিয়ায় এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জর্জ টমাস। তাঁর শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিক জীবনী অনুসারে, তিনি দরিদ্র পরিবেশে বড় হয়েছিলেন এবং জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সেই নানা ধরনের কাজ করতে বাধ্য হন।

তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৭৮১ সালের কাছাকাছি সময়ে তিনি ভারতে মাদ্রাজ উপকূলে এসে পৌঁছান। কিন্তু নৌবাহিনীর কঠোর জীবন তাঁর পছন্দ হয়নি। ফলে জাহাজ ছেড়ে তিনি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন।

প্রথমদিকে তিনি দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় সামরিক গোষ্ঠী ও পলিগারদের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে হায়দরাবাদের নিজামের সেনাবাহিনীতেও কিছুদিন কাজ করেন। সেই সময় ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছিল, মারাঠা শক্তির বিস্তার ঘটছিল এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসক নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছিলেন।

এই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশই জর্জ টমাসের মতো বিদেশি ভাগ্যান্বেষীদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়।

১৭৮৭ সালের দিকে জর্জ টমাস দিল্লি অঞ্চলে পৌঁছে যান এবং সর্দানার শাসক বেগম সমরুর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বেগম সমরু ছিলেন অষ্টাদশ শতকের উত্তর ভারতের একজন প্রভাবশালী নারী শাসক। তাঁর অধীনে ইউরোপীয় সামরিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত একটি সুসংগঠিত বাহিনী ছিল।

জর্জ টমাসের সামরিক দক্ষতা, সাহস এবং নেতৃত্বের ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে বেগম সমরু তাঁকে নিজের বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন সাধারণ সৈনিক থেকে সেনানায়কে পরিণত হন।

তবে বেগম সমরুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পরবর্তীকালে জটিল হয়ে ওঠে। মতবিরোধ এবং দরবারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তিনি বেগমের বাহিনী ছেড়ে মারাঠা নেতা আপ্পা রাওয়ের অধীনে যোগ দেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর এই পরিবর্তনের সময় ও কারণ নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

মারাঠা বাহিনীতে কাজ করার সময় জর্জ টমাস সৈন্য সংগঠিত করা, তাদের ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পান। বিনিময়ে তিনি ঝাজ্জর অঞ্চলে কর্তৃত্ব লাভ করেন এবং উত্তর ভারতের সামরিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকেন।

স্থানীয় ভারতীয়দের মধ্যে তিনি জাহাজি সাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর সামরিক জীবন এবং নৌবাহিনীতে প্রাথমিক কর্মজীবনের সঙ্গে এই নামটির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।

জর্জ টমাস হিন্দুস্তানি ও ফারসি ভাষাও শিখেছিলেন। ফলে স্থানীয় সৈন্য, প্রশাসনিক কর্মচারী এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা তাঁর পক্ষে সহজ হয়ে ওঠে।

১৭৯৭ সালের পর জর্জ টমাস নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন রূপ দেন। মারাঠা শক্তির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন। হানসি, হিসার, সিরসা ও রোহতক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর প্রভাব বিস্তার লাভ করে।
হানসি হয়ে ওঠে তাঁর রাজধানী। সেখানে তিনি একটি দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলেন। নিজের সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার জন্য কামান নির্মাণ, অস্ত্র উৎপাদন এবং মুদ্রা প্রচলনের ব্যবস্থাও করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এইভাবে একজন সাধারণ আইরিশ নাবিক উত্তর ভারতের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্বাধীন শাসকে পরিণত হন। তাঁকে অনেক সময় হানসির রাজা বা রাজা জর্জ টমাস বলা হয়। তবে তিনি আধুনিক অর্থে সমগ্র হরিয়ানা রাজ্যের রাজা ছিলেন না। তাঁর কর্তৃত্ব ছিল মূলত বর্তমান হরিয়ানার হিসার, হানসি, সিরসা ও রোহতক অঞ্চলের কিছু অংশে বিস্তৃত একটি আঞ্চলিক রাজ্য বা প্রিন্সিপ্যালিটির উপর।

তাঁর উত্থানের সময় উত্তর ভারতে মারাঠা, শিখ, জাঠ ও রাজপুত শক্তির মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছিল। জর্জ টমাসও নিজের রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাঁকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলে।

১৭৯৯ থেকে ১৮০১ সালের মধ্যে মারাঠা বাহিনীর ইউরোপীয় সেনানায়ক এবং বিভিন্ন শিখ ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে তাঁর একাধিক সংঘর্ষ হয়। প্রথমদিকে তিনি কিছু সাফল্য পেলেও সম্মিলিত প্রতিপক্ষের বিপুল সামরিক শক্তির সামনে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পিছিয়ে আসতে হয়।

অবশেষে ১৮০১ সালের শেষভাগ থেকে ১৮০২ সালের গোড়ার দিকে তাঁর সামরিক শক্তির পতন ঘটে। ঐতিহাসিক বিবরণে আত্মসমর্পণের সঠিক তারিখ নিয়ে সামান্য পার্থক্য রয়েছে; তবে ১৮০২ সালের জানুয়ারির গোড়ায় তিনি আত্মসমর্পণ করেন বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
আত্মসমর্পণের পর তাঁকে ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কলকাতায় পৌঁছে সেখান থেকে নিজের জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডে ফিরে যাওয়া।

কিন্তু ইতিহাস তাঁর জন্য অন্য পরিণতি অপেক্ষা করে রেখেছিল।
১৮০২ সালে কলকাতার উদ্দেশ্যে গঙ্গা নদীপথে যাত্রা করেন জর্জ টমাস। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, সামরিক অভিযান এবং রাজনৈতিক সংঘাতের পর তিনি তখন পরাজিত, ক্লান্ত এবং অসুস্থ।

যাত্রাপথে বহরমপুরে এসে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৮০২ সালের ২২ আগস্ট, মাত্র ৪৬ বছর বয়সে, এই বহরমপুরেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর বিবরণে জ্বরের কথা উল্লেখ রয়েছে এবং তিনি কলকাতার পথে নদীপথে যাত্রাকালেই মারা যান বলে ঐতিহাসিক জীবনীতে বলা হয়েছে।
যে মানুষটি একদিন দক্ষিণ ভারতের উপকূলে নৌবাহিনীর জীবন ছেড়ে অজানা পথে পা বাড়িয়েছিলেন, যিনি উত্তর ভারতে নিজের সামরিক শক্তির জোরে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ পরিণতি ঘটল বাংলার মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে।

এই বাবুলবোনা রেসিডেন্সি সমাধিক্ষেত্রেই তাঁর সমাধি রয়েছে বলে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভাবতে অবাক লাগে, আয়ারল্যান্ডের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান কীভাবে অষ্টাদশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিজের ভাগ্য গড়ে তুলেছিলেন! তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের বড় বড় পরিবর্তনের আড়ালে এমন অনেক মানুষের কাহিনি লুকিয়ে থাকে, যাঁদের নাম আজ খুব বেশি আলোচিত হয় না।

সবুজ ঘাস, পুরোনো সমাধিফলক আর নীরব পরিবেশের মধ্যে শুয়ে রয়েছেন সেই মানুষটি—যাঁর জীবন একসময় উত্তর ভারতের সামরিক রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছিল।

বাবুলবোনা সমাধিক্ষেত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম হেনরি ক্রিকটন। তিনি ছিলেন মালদহ অঞ্চলে কর্মরত একজন নীলকুঠির কর্মকর্তা এবং গৌড়ের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের জন্য পরিচিত।

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে মালদহের গোয়ালমাটি নীলকুঠির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্রিকটন। প্রাচীন গৌড় নগরীর ধ্বংসাবশেষ, তার স্থাপত্য এবং অতীত ইতিহাস সম্পর্কে তিনি অনুসন্ধান চালান। তাঁর রচিত Ruins of Gaur গ্রন্থটি গৌড়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে প্রাথমিক ইউরোপীয় বিবরণগুলির অন্যতম।

গৌড় একসময় বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। আজ মালদহের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা তার ধ্বংসাবশেষ সেই সমৃদ্ধ অতীতের স্মৃতি বহন করছে।

ক্রিকটনের বন্ধু উইলিয়াম গ্রান্টও মালদহের নীল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রচলিত বিবরণ অনুসারে, ১৮০৭ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতার পথে যাত্রাকালে অসুস্থ হয়ে এই দুই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয় এবং তাঁদের সমাধি বহরমপুরের এই সমাধিক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।

তবে ক্রিকটন ও গ্রান্টের মৃত্যুর সঠিক তারিখ, সমাধির অবস্থান এবং তাঁদের কর্মজীবনের নির্দিষ্ট বিবরণ চূড়ান্ত করার জন্য সমাধিফলক ও সমসাময়িক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এখানে আরও কয়েকজন ইউরোপীয় বাসিন্দার সমাধি রয়েছে, যাঁদের মধ্যে রবার্ট ক্রিকটন এবং লেখিকা মিসেস শেরউডের অল্পবয়সি পুত্র হেনরি শেরউডের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁদের জীবন ও মৃত্যুর বিবরণও বহরমপুরের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

বহরমপুরের বাবুলবোনা রেসিডেন্সি সমাধিক্ষেত্র কেবল কয়েকটি পুরোনো কবরের সমষ্টি নয়। এটি বাংলার ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক ও প্রশাসনিক বিস্তার এবং অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় বাসিন্দাদের জীবনকাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

এখানে যেমন শায়িত রয়েছেন ব্রিটিশ সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরা, তেমনই রয়েছেন জর্জ টমাসের মতো এক ব্যতিক্রমী ভাগ্যান্বেষী, যাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ ভারত থেকে হরিয়ানা পর্যন্ত বিস্তৃত এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।