কাজী খায়রুল আনাম
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তা কিছুটা হলেও পূরণ করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, সমরেশ বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের সাহিত্য বলয়, সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। পাশাপাশি আব্দুল আজিজ আল-আমানের কালপর্বে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিল আনকোরা এক সাহিত্যচর্চা। আজ বাংলাসাহিত্য যখন বিশ্ব-সাহিত্যের নাগাল নিতে মরিয়া। বাংলার উপেক্ষিত সাহিত্যচর্চার আসরটি তখন রাজপথের সন্ধানে । যদিও সৃজনশীল সাহিত্যে এখনও অভাবের সংসার। একেবারে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত যে নেই তা নয়। গল্পকার মোঃ আবেদ আলি তাঁর গল্পগ্রন্থে নির্ভরতা জুগিয়েছেন। এতদিন গল্প পড়তে গিয়ে স্কুল ম্যাগাজিন পর্যায়ের গল্প পড়ে যাঁরা হতাশ হয়েছেন, ‘অন্য গাঁয়ের আখ্যান’ তাঁদের আশ্বস্ত করবে, সন্দেহ নেই।
গল্প সংকলনে রয়েছে আটটি গল্প, ছোটগল্প। গল্পগুলি হল, গ্রাম্য বধূর গল্প, মাদারের মা, বায়োডাটা, পাঁচু দালাল, দীলবার ও কাজেম, সাতকড়ির স্বপ্নভঙ্গ, হোকাই চাচা ও আনার মাস্টার। প্রত্যেকটি গল্পে রয়েছে গ্রাম্য জীবনের গল্পকথা। পেশায় ডাক্তারবাবু— গল্পকার মোঃ আবেদ আলি গ্রন্থের প্রথম গল্প গ্রাম্যবধুর গল্প-তে গ্রাম্যজীবনের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে শিক্ষাহীন সমাজের কুসংস্কারের প্রভাব, গল্পে তিনি পাঠককে সচেতন করতে প্রয়াসী হয়েছেন। সেই সঙ্গে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে ছোটবউয়ের এক মজার সংলাপে গম্ভীর পাঠককেও হাসতে বাধ্য করেছেন।
গল্পের বিষয় অনেকটা আগের গ্রাম বাংলা। গ্রাম বাংলায় আজও অশিক্ষা অজ্ঞতা কুসংস্কারের প্রভাব হয়তো অনেকক্ষেত্রে বিরাজমান। তথাপি আজকের বাংলায় রাস্তাঘাট পরিবহন স্বাস্থ্য পরিষেবার অনেক উন্নতি হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অভাবী মানুষের কাছে সহজ সরল নিয়মিত ও পরিচ্ছন্নভাবে সরবরাহ করেছেন। স্পষ্টত, কথাকার মোঃ আবেদ আলি প্রান্তিক জনের সেবক বলেই গ্রাম্যজীবনের ছবিতে এক অন্য মাত্রা দান করতে পেরেছেন। একই গ্রাম্যজীবনের ছবি রয়েছে ‘মাদারের মা’ গল্পেও। সেখানেও তিনি পাঠককে আনন্দ দান করার চেষ্টা করেছেন। এবং সর্বাংশে সফল হয়েছেন।
গ্রামীণ জীবনের কথাকার মোঃ আবেদ আলি ‘বায়োডাটা’ গল্পে সময়ের উত্তরণ ঘটিয়েছেন। এসেছে উচ্চ শিক্ষা, শিক্ষাগত পেশা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বদল। সামাজিক জীবনের উত্তরণের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই গল্পের মূল ভাষ্যে। ‘পাঁচু দালাল’ গল্পেও কথাশিল্পী হাসি-মজা করেছেন। এবং পাঠককে সরল আনন্দ দান করেছেন। পল্লিজীবনের সাধারণ মনুষ্য চরিত্রের আরও একটা অন্য দিক উন্মোচন করেছেন পাঁচু দালালের ধূর্ত মানসিকতা চিত্রণের মাধ্যমে। তিনি ‘দীলবার ও কাজেম’ গল্পে মায়ের মর্যদাকে মহিমান্বিত করেছেন। শিক্ষার আলো যে প্রতিটি মানুষকে আলোকিত করতে পারে না, তা গল্পকারের এই গল্পে প্রতীয়মান। ‘সাতকড়ির স্বপ্নভঙ্গ’ গল্পেও অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের পরিণতি স্পষ্ট ।
‘হোকাই চাচা’ গল্পে গ্রাম্যজীবনের পুরাতন ছবি ফুটে উঠেছে। সময়ের পরিবর্তন দেখিয়ে গল্পকার দ্বন্দ্ববাদে মানসিকতার উত্তরণ ঘটিয়েছেন। তৈরি করেছেন গ্রাম্য মানসিকতার এক সুন্দর চরিত্র হোকাই চাচা। তাঁর মাধ্যমে গ্রামের শিক্ষা তুলে ধরেছেন তিনি। তুলে ধরেছেন, গ্রামের সহজ সরল গ্রামীণ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। এই সব চরিত্র ও ঘটনার মাধ্যমে গল্পকার তাঁর শৈল্পিক মননের এক অসাধারণ ‘গল্পছবি’ এঁকেছেন। এবং নিজস্ব ভাষা বৈশিষ্ট্যে স্বকীয়তার ঔজ্জ্বল্যে নিজস্বতা তৈরি করেছেন।
গল্পকারের সবশেষে উল্লেখযোগ্য সংযোজন , ‘আনার মাস্টার’। গল্পকার জানিয়েছেন, এটা গল্প নয়, স্মৃতিকথা। এখানে তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী গ্রামবাংলার পাঠশালার স্মৃতি গল্পচ্ছলে বলেছেন। যেখানে তিনি নিজেই ছিলেন একজন শিক্ষার্থী। সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের নৈতিকমানের নিম্নমুখী প্রবণতার যুগে গল্পকারের এই স্মৃতিকথা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। আলাকুইলি গ্রামের শিক্ষকের মাধ্যমে গল্পকার আজকের অবক্ষয় স্মরণ করাতে চেয়েছেন। দেখিয়েছেন, অভাবী বাস্তবতার চিত্র, বৈভবহীন শিক্ষা প্রচেষ্টা। দেখিয়েছেন, আজকের দিনের সঙ্গে ব্যবস্থাগত পরিবর্তন, শিক্ষক হৃদয়ের পুরাতনী আন্তরিকতার অভাব। সময় ও মানসিকতার পরিবর্তনের মাঝে দাঁড়িয়ে গল্পগুলি পাঠক সমাজকে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করবে। গল্পকার গল্পের প্লট নির্বাচন করতে গিয়ে আজকের প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ ব্যবস্থার জটিল জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে যাননি ।
তিনি হারানো বাংলার শিক্ষা ও সমাজের উঁচুতলা থেকে দূরে থাকা মানুষের জীবনযাত্রা চিত্রণের মাধ্যমে পুরো গল্পগ্রন্থটিকে নৈতিক শিক্ষার উপাদান হিসাবে উপস্থাপিত করেছেন। ‘অন্য গাঁয়ের আখ্যান’ গল্প সংকলনে কথাশিল্পীর ভাষায় ভেসে উঠেছে পল্লিজীবনের হারানো চিত্র। তাঁর সহজ সরল ভাষার সাবলীল প্রয়োগে মূর্ত হয়ে উঠেছে হারানো সময়ের বঙ্গজীবন। গল্পের চরিত্ররা সাদামাটা, প্রাচীন অজ্ঞতায় তাঁরা কুসংস্কারের শিকার। তাদের স্বকীয়তাকে ব্যবহার করেছেন গল্পকার। কথা বলেছেন, তাঁদের ভাষাতেই। সারফুদ্দিন আহমেদের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ, গল্পের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাযুজ্য হয়েছে।
পরিশেষে, সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এই গল্পগ্রন্থটি সমকালীন জীবনবোধ, মানবিক অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতার এক সুসংহত শিল্পরূপ। গল্পকার অসাধারণ দক্ষতায় মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম টানাপোড়েনে ও সমাজবাস্তবতার গভীর স্তরগুলোকে গল্পের কাঠামোয় রূপ দিয়েছেন। তাঁর চরিত্র নির্মাণের বাস্তবতা এবং গল্প বলার স্বাতন্ত্র্য ভঙ্গি পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আবদ্ধ রাখে। গল্পকার সংক্ষিপ্ত পরিসরে গভীর বক্তব্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন, যা পাঠককে ভাবনায় নিমগ্ন করে। বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র গল্পগুলিকে পাঠযোগ্য ও স্মরণীয় করে তুলেছে।
কিছু গল্পে অসমাপ্তির অনুভূতি থাকলেও তা পাঠকের কল্পনাকে উসকে দেয়—যা সাহিত্যের একটি শক্তিশালী দিক। প্রতিটি গল্প পাঠশেষে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। সাহিত্যরুচিসম্পন্ন পাঠকের জন্য এই গল্পগ্রন্থ নিঃসন্দেহে এক অনন্য পাঠানুভব, যা শুধু বিনোদন নয়—মনন ও উপলব্ধির পরিসরও বিস্তৃত করে। বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজে এ গ্রন্থটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যায়। সব মিলিয়ে, এই গল্পগ্রন্থটি বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন এবং সাহিত্যপ্রেমী পাঠকদের জন্য পাঠ্যতালিকায় রাখার মতো একটি মূল্যবান গল্পগ্রন্থ।
অন্য গাঁয়ের আখ্যান,
মো. আবেদ আলি।।
উদার আকাশ।। ঘটকপুকুর, ভাঙড় গোবিন্দপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।। মূল্য – ৭০ টাকা।