কলাম, রাজনীতি ইঞ্জিন ডবল, তবু সবার পিছনে পশ্চিমবঙ্গ

‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হয়েছে রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গ ছুটবে, এগোবে দারুন, অনেকে আশা করেছিলেন এমনই। কিন্তু রাজ্যের এই সামনের সারিতে হাজির উঠে আসা যাঁদের জীবনযাপনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, সেই গ্রামীণ গরিবের....

‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হয়েছে রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গ  ছুটবে, এগোবে দারুন, অনেকে আশা করেছিলেন এমনই। কিন্তু রাজ্যের এই সামনের সারিতে হাজির উঠে আসা যাঁদের জীবনযাপনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, সেই গ্রামীণ গরিবের কাজের হালে দেশে পশ্চিমবঙ্গ এখন সব্বার পিছনে।

ভিবিজি রামজি প্রকল্পে গ্রামের গরিবের কাজ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে গড়ে মাত্র ৫.১দিন করে কাজের বন্দোবস্ত করতে পেরেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। জাতীয় গড়ও অল্পই— মাত্র ১৫.১ দিন। তবু পশ্চিমবঙ্গ দেদার পিছিয়ে। বাকি রাজ্য কিংবা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের থেকে গড় কাজের দিন বেশি।

গত ১লা জুলাই সারা দেশে চালু হয়েছে ‘বিকশিত ভারত – গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)।’ ভিবিজি রামজি নামেই তা পরিচিত। প্রথম ইউপিএ সরকারের সময়কালে প্রধানত বামপন্থীদের দাবিতে চালু হয়েছিল ১০০দিনের কাজের নিশ্চয়তা আইন। যা মনরেগা নামে পরিচিত ছিল। তা পালটেই ভিবিজি রামজি করেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। গ্রামবাসী জবকার্ডধারী পরিবারগুলির বছরে ১২৫দিনের কাজের বন্দোবস্ত হবে, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েই এই নতুন আইন চালু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই আইনে চাষের মরশুমে দু’ দফায় ৬০দিন কাজ হবে না। এর পিছনে আছে একটি কৌশল। চাষের মরশুমে কৃষকরা যাতে কম মজুরিতে দিনমজুর পান, সেই লক্ষ্যেই ওই সময়ে ভিবিজি রামজি’র কাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩৬৫ দিনের বছরে ৬০দিন বাদ থাকলে রয়ে যায় ৩০৫দিন। তার মধ্যে ১২৫দিন কাজ পাবেন গ্রামবাসী জবকার্ডধারীরা, প্রতিশ্রুতি এমনই। পশ্চিমবঙ্গে একদফায় ২৫দিন, অর্থাৎ ১৫ই জুলাই থেকে ১০ই আগস্ট পর্যন্ত ভিবিজি রামজি’র কাজ বন্ধ ছিল। তবু ১২ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের জবকার্ডধারীরা কাজ পেতে পারেন এমন দিন ছিল ৫০। জবকার্ডধারীরা কাজ পেয়েছেন ৫.১ দিন।

তবে এই সবার পিছনে থাকা রাজ্যে সবার পিছনে থাকা জেলা কোনটি? সেটি  পূর্ব মেদিনীপুর। এ’ হলো সেই জেলা, যেখানে বাড়ি আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। ভিবিজি রামজি’তে পূর্ব মেদিনীপুরে যাঁরা কাজ পেয়েছেন, তাঁরা পেয়েছেন গড়ে ৪.১ দিনের কাজ।

মোদ্দা কথা-  ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের শাসনে রাজ্যে গ্রামবাসীদের কাজের দুর্দশা মারাত্মক। এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হবে যে, গত প্রায় তিন বছর রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে মনরেগার কাজ থেকে বঞ্চিত ছিলেন মানুষ। কারন, সেই প্রকল্পের কোনও টাকা পশ্চিমবঙ্গের জন্য বরাদ্দ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। অভিযোগ ছিল দুর্নীতির। ১০০ দিনের কাজে দেদার দুর্নীতি হয়েছিল তৃণমূলের শাসনে, সন্দেহ নেই। ভুয়ো জবকার্ডে ভুয়ো মাস্টাররোল ব্যবহার করে, যে কাজ হয়নি তা হয়েছে দেখিয়ে চুরি করা হয়েছে মনরেগার কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তার জন্য তৃণমূলের নির্বাচিত কোনও পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির শাস্তি হয়নি। কয়েকজন পঞ্চায়েত কর্মী, অফিসারের শাস্তি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। মনরেগায় চুরি হওয়া টাকা ফেরতের কোনও পদক্ষেপ রাজ্যের বিজেপি সরকারও গত তিন মাসে নেয়নি। ক্ষতি যা হয়েছে তা গ্রামের গরিবের। তাঁরা তিন বছর এক ঘন্টার জন্য কাজ পাননি।

সেই পরিস্থিতি বদলের কোনও চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে না। রাজ্যে জবকার্ড আছে ১কোটি ২৮লক্ষ ৮৯ হাজার ৮৪৩টি পরিবারের। কাজ পেয়েছে ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৫২৭টি পরিবার। অর্থাৎ জবকার্ড আছে এমন পরিবারগুলির ১ শতাংশেরও কম ভিবিজি রামজি’তে কাজ পেয়েছে। ১২ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছবিটি এমনই।

রাজ্যের জেলাগুলির মধ্যে সবার পিছনে আছে পূর্ব মেদিনীপুর। সেখানে জবকার্ড আছে ৮লক্ষ ৭৯ হাজার ৫৪১টি পরিবারের। কাজ পেয়েছে মাত্র ৬৭২৪টি পরিবার! কত শতাংশ? ০.৭৭!

 

পূর্ব মেদিনীপুরে নন্দীগ্রাম। সেখানে দুটি ব্লক। নন্দীগ্রাম-১ নং ব্লকে আছে জবকার্ডধারী ৩৮হাজার ৫৬৩টি পরিবার। কাজ পেয়েছে ১৩৮টি পরিবার। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছেন সংখ্যাটি। নন্দীগ্রাম-২নং ব্লকে জবকার্ড আছে ২৬ হাজার ৭৫৯টি পরিবারের। কাজ পেয়েছে ৩০৭টি পরিবার।

রাজ্যে কাজের অভাব সব জেলাতেই আছে। তার মধ্যে সুন্দরবন এবং জঙ্গলমহলের মতো এলাকায় সেই সঙ্কট আরও প্রকট। কী অবস্থা সেখানকার?

 

 

সুন্দরবনের কুলতলি ব্লক একটি উদাহরণ হতে পারে। এই ব্লকের গ্রামগুলিতে জবকার্ড আছে ৬৭হাজার ৫৮২টি পরিবারের। কাজ পেয়েছে ৬২টি পরিবার! এই ব্লকের ৯টি পঞ্চায়েতের মধ্যে দেউলবাড়ি-দেবীপুর, কুন্দখালি গোদাবর এবং মেরীগঞ্জ-১, এই ৩টিতে একটি পরিবারও কাজ পায়নি।

সুন্দরবনের আর একটি ব্লক গোসাবা। জবকার্ড আছে ৫০হাজার ৬৮টি পরিবারের। কাজ পেয়েছে ৪৪টি পরিবার। এই ব্লকে ১৪টি পঞ্চায়েত। ১১টি পঞ্চায়েতে কেউ কাজ পায়নি।

 

 

এমন নিদারুণ উদাহরণ রাজ্যের প্রতি ব্লকেই। প্রশ্ন হলো– এই দুর্দশা কেন? উত্তর খুব কঠিন নয়। পরিকল্পনার অভাব। ৩৩৫৯টি পঞ্চায়েত। বেশিরভাগ নিষ্ক্রিয়। প্রধান, উপপ্রধান, বেশিরভাগ সদস্য তৃণমূলের। কিন্তু তারা বাধা নন। কারণ বর্তমান শাসক দল বিজেপির স্থানীয় নেতাদের  কথা মতোই তারা চলছেন। বিধায়কও বেশিরভাগ বিজেপির। বিরোধী তৃণমূলের যে বিধায়করা আছেন তাদের সিংহভাগ বিজেপির কথাতেই উঠছেন, বসছেন। কিন্তু তাদের কেউই গ্রামের মানুষের কাজের কথা তুলছেন না। জেলাশাসক থেকে বিডিও–ভিবিজি রামজি’র কাজ মূলত তাদের উপর নির্ভরশীল। রাজ্যের সরকারের নির্দেশের উপর তাদের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

 

 

গ্রামের গরিবের কাজ রাজ্যের সরকারের অগ্রাধিকার নয়। ‘সিপিএম- এর বুকস্টল’, ‘দুর্গাপুজো নাকি শারদোৎসব’ এই বিতর্ক তৈরিতে ব্যস্ত বিজেপির কাছে গ্রামের গরিবের কাজের প্রশ্ন ব্রাত্য। আর একটি সমস্যাও আছে। ঠিক কীভাবে এই ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করতে হয়, পঞ্চায়েত পরিচালনার সেই ভাবনা বিজেপি’র নেই। রাজ্য কিংবা পঞ্চায়েত স্তরে বিজেপি’র নেতাদের মধ্যে পঞ্চায়েতকে গ্রামোন্নয়নে ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা নেই। আছে সদিচ্ছার অভাবও।